চীনের সামরিক সক্ষমতার দ্রুত বিস্তার যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আগের তুলনায় আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে বলে মন্তব্য করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। তবে ওয়াশিংটন বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কোনো জোরপূর্বক বা আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চীনের সামরিক উন্নয়ন নিয়ে কংগ্রেসে জমা দেওয়া পেন্টাগনের বার্ষিক প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে হংকংভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রায় ১০০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য চীনের ওপর আধিপত্য বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ বা হেয় করা নয়। বরং লক্ষ্য হলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হতে না দেওয়া, যাতে কোনো দেশ যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, চীনের সাম্প্রতিক ও ব্যাপক সামরিক আধুনিকায়নের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড আগের চেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এতে বেইজিংয়ের পরমাণু অস্ত্রভান্ডার, নৌবাহিনীর সক্ষমতা, দূরপাল্লার প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র, সাইবার প্রযুক্তি এবং মহাকাশ গবেষণায় অগ্রগতিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা সরাসরি মার্কিন নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
পেন্টাগনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্য হলো এমন প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বজায় রাখা, যাতে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ আগ্রাসনের চিন্তা থেকে বিরত থাকে এবং এর মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
প্রতিবেদনটিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রশাসনের সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সামরিক সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরের তুলনায় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্পের নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে এবং পেন্টাগন পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগ্রহী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কৌশলগত স্থিতিশীলতা, উত্তেজনা প্রশমন এবং ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে পিএলএর সঙ্গে সামরিক যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা চালানো হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তার শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে অন্যান্য কূটনৈতিক পথও অনুসন্ধান করবে।
এতে চীনের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতার একটি উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, বেইজিংয়ের সামরিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘জাতীয় সর্বাত্মক যুদ্ধ’ ধারণা, যেখানে সমগ্র জাতির সম্পদ ও সক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করার পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত।
‘পিপলস রিপাবলিক অব চায়না সংশ্লিষ্ট সামরিক ও নিরাপত্তা উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের সামরিক বাহিনী ২০২৭ সালকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের পথে এগোচ্ছে। এসব লক্ষ্য তাইওয়ান ইস্যু, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
প্রতিবেদনে তাইওয়ান প্রসঙ্গেও অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে। বেইজিং তাইওয়ানকে চীনের অংশ মনে করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পুনরায় একীভূত করার অবস্থানে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ দেশ তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও, ওয়াশিংটন দ্বীপটিকে শক্তি প্রয়োগ করে দখলের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে এবং তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষামূলক সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করে আসছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্ক ধীরে ধীরে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, যা আংশিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অভিন্ন স্বার্থের প্রতিফলন হতে পারে। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এই সহযোগিতারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল (এনএসএস) প্রকাশের কয়েক সপ্তাহ পর সামনে এলো। ওই কৌশলপত্রে চীনের তুলনায় অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং পশ্চিম গোলার্ধের কৌশলগত গুরুত্বের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, যদিও প্রতিবেদনটি দ্রুত প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এতে কিছু তথ্য সেকেলে মনে হতে পারে, তবুও এটি পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস চীন-মার্কিন সম্পর্ককে কীভাবে দেখছে, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। ইউরেশিয়া গ্রুপের সিনিয়র অ্যানালিস্ট জেরেমি চ্যান বলেন, প্রতিবেদনের ভাষা চীনের প্রতি তুলনামূলকভাবে গঠনমূলক এবং এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে বলে তুলে ধরা হয়েছে।
শেনিয়াংয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটের সাবেক কর্মকর্তা চ্যান মনে করেন, প্রতিবেদনটি চীনের সামরিক অগ্রগতি স্বীকার করলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে অতিরঞ্জিত কোনো পূর্বাভাস দেয়নি। তাঁর মতে, চীনের সামরিক শক্তির বৈশ্বিক বিস্তার সময়ের ব্যাপার মাত্র, যা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা নীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
