বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তৃতীয় দেশে অভিবাসী পাঠানো মানবাধিকার লঙ্ঘন: জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬

তৃতীয় দেশে অভিবাসী পাঠানো মানবাধিকার লঙ্ঘন: জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজ দেশের বাইরে তৃতীয় কোনো দেশে অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের পাঠানোর নীতির কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের দুই ডজন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ। তাদের দাবি, এ ধরনের ব্যবস্থা অভিবাসীদের জন্য গুরুতর ও কখনো প্রাণঘাতী পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালে আবার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশের সরকারকে অর্থের বিনিময়ে এমন অভিবাসীদের গ্রহণে রাজি করিয়েছে, যাদের সঙ্গে ওই দেশগুলোর কোনো সম্পর্ক নেই। এখন পর্যন্ত ৩৫টি দেশের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি হয়েছে, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আফ্রিকার দেশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২০ হাজার মানুষকে বাসে করে মেক্সিকোতে পাঠানো হয়েছে। আরও ৫ হাজারের বেশি মানুষকে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিমানে পাঠানো হয়েছে।

সোমবার জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের পরামর্শক ২৪ বিশেষজ্ঞ এবং আফ্রিকান কমিশনের একজন বিশেষ প্রতিবেদক যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট ৩৫টি দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ নীতি অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

যৌথ বিবৃতিতে বিশেষজ্ঞরা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এ ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট ক্ষতি এখন আর কেবল আশঙ্কার বিষয় নয়। বিশেষ ঝুঁকিতে থাকা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এর পরিণতি প্রাণঘাতী হতে পারে। নিজ দেশের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই এমন দেশে পাঠানো ব্যক্তিরা নির্যাতন, নিপীড়ন ও জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন বলেও তারা সতর্ক করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচিতি বা সামাজিক যোগাযোগবিহীন দেশে পাঠানো অভিবাসীদের জন্য একটি বিচ্ছিন্ন ও মানসিকভাবে আঘাতমূলক অভিজ্ঞতা হতে পারে। কেউ কেউ লিঙ্গ, যৌন অভিমুখিতা, লিঙ্গপরিচয় বা মানবাধিকারকর্মের কারণে সহিংসতা ও বৈষম্যের ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তাদের নির্বাসন কার্যক্রম মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে অপরাধীদের সরিয়ে দেওয়ার ওপর কেন্দ্রীভূত। তবে দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে তৃতীয় দেশে পাঠানো কয়েকজন অভিবাসীর ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে ইরানের এক নারী এবং ঘানার এক সমকামী পুরুষও রয়েছেন, যারা নিজ নিজ দেশে নিরাপত্তাহীনতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করে বলেছেন, অপরিচিত দেশে পাঠানো অভিবাসীরা মানব পাচার ও দাসত্বসহ অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি করেছে, সেগুলোর কিছু দেশে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্যসংকট ও দারিদ্র্য রয়েছে। এসব দেশের অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষার সক্ষমতাও সীমিত বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

মানবাধিকার আইনজীবীদের অভিযোগ, তৃতীয় দেশে পাঠানোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন নিজ দেশের আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে যেসব দেশে কোনো ব্যক্তির নিপীড়নের আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে সরাসরি তাকে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু তৃতীয় দেশে পাঠানোর পর সেখান থেকে অনেককে তাদের নিজ দেশে পাঠানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

গ্লোবাল স্ট্র্যাটেজিক লিটিগেশন কাউন্সিলের আঞ্চলিক আইনজীবী বিট্রিস নাজেরি বলেন, আফ্রিকার যেসব দেশ এ ধরনের চুক্তিতে যুক্ত হয়েছে, তারা চুক্তি বন্ধে করা আইনি উদ্যোগ ও মানবাধিকারকর্মীদের আহ্বানে খুব কম গুরুত্ব দিয়েছে। তার মতে, জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের বিবৃতি এসব দেশকে জবাবদিহির আওতায় আনার প্রচেষ্টায় ভূমিকা রাখতে পারে।

নাজেরি ইউরোপীয় কয়েকটি দেশেরও অভিবাসীদের জন্য অফশোর কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে সতর্ক করেছেন। তার মতে, আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তির বাস্তবায়ন থেকে ইউরোপীয় দেশগুলোরও শিক্ষা নেওয়া উচিত।