আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে মহাকাশে সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিভিন্ন দেশ স্যাটেলাইটে হামলা চালানোর উপযোগী অস্ত্র ও প্রযুক্তি তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাজ্য ও তার মিত্ররা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন সামরিক সক্ষমতা উন্নয়নের সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে। মহাকাশের আবর্জনা অপসারণে কাজ করা যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান অ্যাস্ট্রোস্কেল গোপন সামরিক কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, স্যাটেলাইটে জ্বালানি সরবরাহের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা অরবিট ফ্যাব যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মহাকাশে প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক সক্ষমতা তৈরিতে কাজ করছে।
লন্ডনের কিংস কলেজের ফ্রিম্যান এয়ার অ্যান্ড স্পেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ড. জুলিয়া বালম বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো মহাকাশে মিত্রদেশগুলোর সম্পদকে প্রতিনিয়ত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছে।
লন্ডনে অ্যাস্ট্রোস্কেলের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মহাকাশে সংঘাতের লক্ষণ ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এমন সংঘাত শুরু হতে পারে।
স্যাটেলাইটে হামলায় ব্যাহত হতে পারে স্বাভাবিক জীবন
আধুনিক বিশ্বের যোগাযোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর কার্যক্রমে স্যাটেলাইট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব স্যাটেলাইটে বড় ধরনের হামলা হলে জিপিএস, ইন্টারনেট, টেলিভিশন সম্প্রচার, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। ব্যাংকিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মহাকাশে রাশিয়া ও চীনের সামরিক তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা, ২০২২ সালে উৎক্ষেপণ করা রাশিয়ার কসমস-২৫৫৩ স্যাটেলাইটে পারমাণবিক যন্ত্রের সঙ্গে সম্পর্কিত উপাদান থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
মহাকাশে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটলে সৃষ্ট বিকিরণ ও উচ্চশক্তির কণার কারণে হাজার হাজার স্যাটেলাইট ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে পৃথিবীর কক্ষপথের কিছু অংশ দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া রাশিয়ার কিছু স্যাটেলাইটকে অন্য মহাকাশযানের কাছাকাছি অবস্থান নিতে দেখা গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে রাশিয়ার একটি সামরিক স্যাটেলাইট ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া আইসিআইই এক্স৩৬ নামের একটি স্যাটেলাইটের কাছাকাছি চলে যায়।
অন্যদিকে, কক্ষপথে থাকা বস্তু ধরে ফেলার সক্ষমতাসম্পন্ন মহাকাশযান পরীক্ষা করেছে চীন। দেশটির স্যাটেলাইটগুলো জ্বালানি সরবরাহ এবং কাছাকাছি দূরত্বে অবস্থান পরিবর্তনের সক্ষমতাও দেখিয়েছে।
সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্ত হচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
অ্যাস্ট্রোস্কেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিক শেভ বলেন, শুরুতে তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রতিরক্ষা খাতে কাজ করার পরিকল্পনা ছিল না। তবে ২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যের কৌশলগত প্রতিরক্ষা পর্যালোচনায় মহাকাশকে সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করার পর তাদের কাজের ধরনে পরিবর্তন আসে।
শেভ বলেন, গত দুই থেকে তিন দশক ধরে মহাকাশে কোনো বস্তু পাঠানোর পর সেটি হামলার শিকার হবে না, এমন ধারণা নিয়ে কাজ করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলে যাচ্ছে।
তিনি জানান, শত্রুপক্ষের মহাকাশযান যাতে স্যাটেলাইটের কাছে আসতে না পারে বা সেগুলোর কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য প্রতিরোধমূলক প্রযুক্তি তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে অ্যাস্ট্রোস্কেল।
অরবিট ফ্যাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জ্যাকব গিয়ার বলেন, স্যাটেলাইটের অবস্থান পরিবর্তনের প্রযুক্তি প্রতিরক্ষা ও আক্রমণ, উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা সম্ভব। তার মতে, কাছাকাছি অবস্থানে মহাকাশযান পরিচালনার সক্ষমতা ভবিষ্যতে মহাকাশে সামরিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
মহাকাশের নিরাপত্তায় প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাজ্য
সম্ভাব্য মহাকাশ সংঘাত মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার করছে যুক্তরাজ্য। গত সেপ্টেম্বরে দেশটির রাজকীয় বিমানবাহিনী ব্রিটিশ স্যাটেলাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ মহাকাশ স্কোয়াড্রন গঠনের ঘোষণা দেয়।
যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, মহাকাশে হুমকির গতি, পরিসর ও জটিলতা বাড়ছে।
এদিকে, বিভিন্ন দেশ মহাকাশে ব্যবহারের জন্য লেজার, তড়িৎচুম্বকীয় স্পন্দনভিত্তিক প্রযুক্তি, স্যাটেলাইটের সেন্সর অকার্যকর করার যন্ত্র এবং মহাকাশযান ধরে ফেলার প্রযুক্তি তৈরি করছে। স্যাটেলাইট ধ্বংসে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রও পরীক্ষা করা হয়েছে।
মহাকাশের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থাও তাদের বিভিন্ন প্রকল্পে সামরিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সামরিক প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকলে পৃথিবীর কক্ষপথ ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংঘাতের নতুন ক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
