শনিবার, ২৯ আগষ্ট ২০২৬

ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভান্ডারে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

শনিবার, আগস্ট ২৯, ২০২৬

ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভান্ডারে নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভান্ডারের বড় একটি অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় নজিরবিহীন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, বেসরকারি তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশটির ৬ হাজার ৫০০ কোটির বেশি ব্যারেল প্রমাণিত তেল মজুতের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও যুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী পিট হেগসেথের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেসের সঙ্গে আলোচনার পর এ চুক্তি হয়েছে। এতে মার্কিন করদাতাদের কোনো অর্থ ব্যয় হবে না বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে চুক্তির বিস্তারিত কাঠামো প্রকাশ করেননি ট্রাম্প। কোন কোন তেলক্ষেত্র বা কোম্পানি এর আওতায় থাকবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে এসব সম্পদের ওপর সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

ভেনেজুয়েলার পক্ষ থেকেও চুক্তিটিকে স্বাগত জানানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস বলেন, চুক্তির আওতায় ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্রের উন্নয়ন করা হলে দেশটির তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে। এর ফলে সরকারের কর রাজস্ব প্রায় ২০ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।

রদ্রিগেস বলেন, প্রস্তাবিত বিনিয়োগ শুধু ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুদ্ধার ও আধুনিকায়নে সহায়তা করবে না, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চুক্তিটিকে দুই দেশের জন্যই লাভজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র স্থিতিশীল ও তুলনামূলক কম দামে অপরিশোধিত তেল পাওয়ার সুযোগ পাবে, যা দেশটির জ্বালানি বাজারে দাম কমাতে সহায়ক হতে পারে।

ভেনেজুয়েলায় এ চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে এবং হাজার হাজার উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলেও জানান রুবিও। তাঁর মতে, এতে দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের কম বিনিয়োগ, অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় অনেক নিচে নেমে গেছে। বর্তমানে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করছে।

ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুজ্জীবিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের শোধনাগারগুলোর জন্য অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে ওয়াশিংটন। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রের কিছু শোধনাগারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তবে প্রস্তাবিত চুক্তির আইনি ও আর্থিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ডেভিড গোল্ডউইন জানতে চেয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সংবিধান ও নতুন হাইড্রোকার্বন আইনের আওতায় মার্কিন সরকারের তেলক্ষেত্র ইজারা নেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি রয়েছে কি না। তাঁর মতে, কোনো দেশের তেলক্ষেত্র পরিচালনার জন্য মার্কিন সরকারের সরাসরি ইজারা নেওয়ার নজিরও নেই।

এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার দুর্বল বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সীমিত রপ্তানি সক্ষমতা এবং তেলশিল্পে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করা না গেলে নতুন চুক্তি বাস্তবে কতটা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভারী অপরিশোধিত তেল উত্তোলন, পরিবহন ও পরিশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করতেও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। ফলে এই চুক্তির কারণে স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম কমবে কি না, সেটিও এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

১৯৭০-এর দশকে ভেনেজুয়েলা তার তেলশিল্প রাষ্ট্রীয়করণ করে। পরে প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের শাসনামলে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত যৌথ উদ্যোগে যেতে বাধ্য করা হয়। একপর্যায়ে এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপসসহ কয়েকটি বিদেশি কোম্পানির সম্পদও অধিগ্রহণ করে দেশটি।

নিকোলাস মাদুরোর শাসনামলে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন আরও দ্রুত কমে যায়। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

এখন ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে দেশটির বিপুল তেলসম্পদের ওপর মার্কিন প্রভাব বাড়ানোর পাশাপাশি নিজেদের জ্বালানি বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করতে চাইছে। তবে চুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ কাঠামো ও আইনি ভিত্তি প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এর প্রকৃত প্রভাব কতটা হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।