বৃহস্পতিবার, ২৭ আগষ্ট ২০২৬

এআই বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুত নয় বিশ্ব: বিল গেটস

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২৭, ২০২৬

এআই বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রস্তুত নয় বিশ্ব: বিল গেটস

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তারে বিশ্ব যে বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তা মোকাবিলায় সরকারগুলো এখনো যথেষ্ট প্রস্তুত নয় বলে সতর্ক করেছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তাঁর আশঙ্কা, আগামী এক দশকে এআইয়ের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ চাকরি হারাতে পারেন। এতে সমাজে বৈষম্যও আরও বাড়তে পারে।

প্রায় ছয় হাজার শব্দের এক নিবন্ধে গেটস বলেছেন, এআইয়ের যুগে প্রবেশ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন সামাল দেওয়ার মতো এখনো কোনো বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা তৈরি হয়নি। সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে এআই বৈষম্য কমানোর শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। তবে ভুলভাবে পরিচালিত হলে এটি বড় ধরনের অবিচারের কারণও হতে পারে।

গেটসের মতে, এআইয়ের অন্যতম বড় ঝুঁকি হলো স্থায়ীভাবে চাকরি হারানোর আশঙ্কা। অতীতে কৃষি থেকে শিল্প এবং পরে অফিসকেন্দ্রিক কাজে মানুষের স্থানান্তরের সঙ্গে এআইয়ের প্রভাবকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। কারণ আগের পরিবর্তনগুলো কয়েক প্রজন্ম ধরে ধীরে ধীরে ঘটেছে। আর এআই সরাসরি মানুষের চিন্তা ও বিশ্লেষণক্ষমতার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।

আইন, চিকিৎসা, গ্রাহকসেবা, সফটওয়্যার ও উৎপাদন খাত আগামী এক দশকে বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করেন গেটস। বিশেষ করে কর্মজীবনে নতুন প্রবেশ করা তরুণদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এআইয়ের কারণে শিক্ষানবিশ ও মধ্যম পর্যায়ের চাকরির সুযোগ কমে গেলে তরুণদের কর্মজীবনে প্রবেশের পথও সংকুচিত হতে পারে।

শুধু দাপ্তরিক কাজ নয়, ভবিষ্যতে শারীরিক শ্রমের চাকরিও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। রোবটের দাম কমে যাওয়ার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বাড়লে নির্মাণ ও আতিথেয়তা খাতেও মানুষের পরিবর্তে রোবট ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। গেটসের ধারণা, চলতি দশকের শেষ নাগাদ এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

এ পরিস্থিতিতে কিছু পেশা মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, এআই কোনো কাজ মানুষের তুলনায় দ্রুত বা কম খরচে করতে পারলেও সব ক্ষেত্রে মানুষকে সরিয়ে দেওয়া উচিত নয়। চিকিৎসা, শিক্ষা ও মানুষের যত্নের মতো কাজে সহানুভূতি, আবেগ ও মানবিক যোগাযোগের প্রয়োজন রয়েছে।

এআইয়ের অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গেটস। তাঁর মতে, সাইবার হামলাকারীরা দ্রুত নতুন সক্ষমতা অর্জন করছে, কিন্তু নিরাপত্তাব্যবস্থা সেই গতিতে এগোতে পারছে না। ফলে হাসপাতাল, ব্যাংক, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এ ধরনের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।

শিশু ও তরুণদের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছেন তিনি। এমন এআই চ্যাটবট, যা ব্যবহারকারীর বক্তব্যকে সব সময় সমর্থন করে এবং কখনো চ্যালেঞ্জ করে না, তা মানুষের কাছে আসক্তিকর হয়ে উঠতে পারে। এতে বিশেষ করে তরুণরা বাস্তব মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, মতবিরোধ মোকাবিলা এবং সামাজিক দক্ষতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হারাতে পারেন।

এআইয়ের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় নতুন নীতির প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন গেটস। তিনি এআই প্রযুক্তি ও রোবটের ওপর কর আরোপের বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, এতে অতিরিক্ত স্বয়ংক্রিয়তার গতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চাকরি হারানো মানুষের পুনঃপ্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হবে।

গেটসের মতে, কোনো একক দেশের পক্ষে এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে সহযোগিতা প্রয়োজন। পারমাণবিক অস্ত্র ও পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলায় যেমন আন্তর্জাতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি।

গেটসের সতর্কবার্তার মূল কথা হলো, এআইয়ের ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর সুযোগ হয়তো আর থাকবে না। চাকরি, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও মানবিক সম্পর্কের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় এখনই নীতিমালা তৈরি করতে হবে। তা না হলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি এআই বড় ধরনের সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।