যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসী দমন-অভিযানে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। শিকাগো, মিনিয়াপোলিস-সেন্ট পল, নিউ অরলিন্স ও ওয়াশিংটন ডিসিতে পরিচালিত অভিযানগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইস), কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (সিবিপি) এবং অন্যান্য ফেডারেল সংস্থার বিরুদ্ধে এই লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সংস্থাটি।
“উই হ্যাড হুইসলস, দে হ্যাড গানস”—শিরোনামের এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন এমন একটি ব্যাপক আটক ও নির্বাসন ব্যবস্থা কার্যকর করছে, যার পেছনে কাজ করছে বর্ণবাদী, বিদেশি-বিদ্বেষী ও মিথ্যা বয়ান, আর যার লক্ষ্য যত বেশি সম্ভব অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থীকে আটক-নির্বাসিত করা এবং অভিবাসী সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে ব্যাপকভাবে ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউএসএর নির্বাহী পরিচালক নাদিয়া দার বলেন, তাঁদের প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি ভীতিকর ধরন উঠে এসেছে, যার লক্ষ্য অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থী সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করা। আইস মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড নতুন কিছু নয় বলে জানিয়ে তিনি বলেন, এই লঙ্ঘন এখন এক বিপজ্জনক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন একাধিক গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটিয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে বেআইনি হত্যাকাণ্ড। যার কিছু ঘটনা বিচারবহির্ভূত হত্যার পর্যায়ে পড়তে পারে। স্বেচ্ছাচারী ও বৈষম্যমূলকভাবে যোগাযোগবিহীন আটক, যা কিছু ক্ষেত্রে জোরপূর্বক গুম হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। এবং এমন আটক-পরিস্থিতি যা নির্যাতনবিরোধী নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করতে পারে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের ওপর সহিংস দমন-পীড়ন এবং আরও অনেক কিছু। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সংস্থাটি এখন আইসকে অবিলম্বে বিলুপ্ত করার দাবিতে কমিউনিটির কণ্ঠস্বরের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারটি অভিযানে নথিভুক্ত লঙ্ঘনগুলো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী কোনো ঘটনা নয়, বরং এটি একধরনের পুনরাবৃত্ত নিপীড়নের অংশ, যার পরিণতি হয়েছে অভিবাসী ও গোটা কমিউনিটির জন্য বিধ্বংসী।
নাদিয়া দার বলেন, মুখোশ পরা ও সশস্ত্র ফেডারেল এজেন্টরা রাস্তায় দায়মুক্তির সঙ্গে মানুষের ওপর আক্রমণ চালালে তা কোনো কমিউনিটিকে নিরাপদ করে না, বরং সবাইকে বিপদে ফেলে। তাঁর ভাষায়, আইস মৌলিকভাবেই ভেঙে পড়েছে এবং একে মেরামত করা সম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ড মেনে চলা একটি অভিবাসন প্রয়োগ ব্যবস্থা পেতে হলে যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে আইস বিলুপ্ত করে নতুন করে শুরু করতে হবে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর আইস প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এবং পরবর্তী বছরগুলোতে গ্রহণ করা হয়েছিল একটি অত্যন্ত সমস্যাসংকুল নিরাপত্তা কাঠামো। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আইস মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তদারকি ও জবাবদিহিতার উদ্বেগজনক অভাবের বিষয়টি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অন্যান্য সংস্থা নথিভুক্ত করে আসছে। কিন্তু ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে যে মাত্রা ও ভয়াবহতা দেখা যাচ্ছে, বিপুল নতুন অর্থায়ন ও অব্যাহত দায়মুক্তির কারণে তা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে জানায় সংস্থাটি।
চারটি অভিযানে অভিবাসী, আশ্রয়প্রার্থী, শরণার্থী, অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত হওয়া মানুষ, কৃষ্ণাঙ্গ ও বাদামি-বর্ণের সম্প্রদায় এবং যাঁরা তাঁদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন বা প্রশাসনের আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। এসব অভিযান গোটা অভিবাসীদের মধ্যে একটি সর্বব্যাপী ভীতিকর পরিবেশও তৈরি করেছে।
চারটি অভিযান জুড়েই যেসব লঙ্ঘন নথিভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে—বর্ণবৈষম্যমূলক অভিবাসন প্রয়োগ অভিযান ও স্বেচ্ছাচারী আটক; ফেডারেল এজেন্টদের হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন, অবমাননাকর আচরণ ও অন্যায্য বলপ্রয়োগ। প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ ও বেআইনি হত্যাকাণ্ড, যা বিচারবহির্ভূত হত্যা হিসেবে তদন্ত হওয়া উচিত; কাঁদানে গ্যাস ও মরিচের গুঁড়াসহ স্বল্প-প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিবাদ দমন। বেআইনি নজরদারি ও মুখাবয়ব শনাক্তকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার। অমানবিক আটক-পরিস্থিতি ও ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত করা, যা নির্যাতন হিসেবে তদন্ত হওয়া উচিত। এবং বেআইনি যোগাযোগবিহীন আটক ও সম্ভাব্য জোরপূর্বক গুমের ঘটনা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইস এজেন্টরা এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশের মধ্যে কাজ করেছেন, যা ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যেই সমর্থন ও সম্প্রসারণ করেছে। যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারাই সহিংস ও বর্ণবৈষম্যমূলক অভিবাসন প্রয়োগ চর্চাকে উৎসাহিত করেছেন। এজেন্টরা প্রায়ই মুখোশ পরে ও পরিচয়পত্র ছাড়াই কাজ করেছেন; অসদাচরণ প্রতিরোধ ও সমাধানের জন্য নির্ধারিত সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল বা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় খুব কমই অর্থবহ তদন্ত বা জবাবদিহিতা দেখা গেছে।
প্রতিবেদনে মিনেসোটার স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ লিশ কোজলোস্কির একটি বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। যিনি ওজিবওয়ে-লাতিনো বংশোদ্ভূত। তিনি জানান, তাঁর গর্ভবতী চাচাতো বোন স্বামীর সঙ্গে অফিসে যাওয়ার পথে গাড়িতে ছিলেন, তখন আইসিই এজেন্টরা এসে বন্দুক তাক করে গাড়ির কাচ ভেঙে ফেলেন এবং তাঁর সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন। তাঁর স্বামী চিৎকার করে বলেন, তিনি নেটিভ আমেরিকান, তাঁর ট্রাইবাল পরিচয়পত্র দেখান—জবাবে এক আইসিই এজেন্ট বলেন, তাতে কিছু যায় আসে না, এটা এখন তাদের জমি।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত এমন কয়েক ডজন ঘটনার মধ্যে এটি একটি মাত্র উদাহরণ, যেখানে আইস এজেন্টদের স্পষ্ট বর্ণ-প্রোফাইলিং করতে দেখা গেছে বলে জানানো হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আমেরিকাস পরিচালক আনা পিকার বলেন, বর্ণের ভিত্তিতে মানুষকে চিহ্নিত করে রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া, পরিবার বিচ্ছিন্ন করা এবং স্বেচ্ছাচারীভাবে আটক রাখা কেবল বেআইনি ও নিষ্ঠুর চর্চাই নয়, এটি গভীরভাবে ক্ষতিকরও। এই চর্চাগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এবং শিশু, পরিবারের অন্য সদস্য ও গোটা সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় ও মানসিক দুর্দশা এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যার জন্ম দেয়।
প্রতিবেদনে এটাও তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে কমিউনিটি একে অপরকে রক্ষা করতে ও প্রতিরোধ গড়তে একত্র হয়েছে। পারস্পরিক সহায়তা নেটওয়ার্ক, সাংবিধানিক পর্যবেক্ষক প্রশিক্ষণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া নেটওয়ার্ক এবং শিশুদের স্কুলে যাওয়া-আসায় সঙ্গ দেওয়ার মতো উদ্যোগের মাধ্যমে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ানো ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে এই নেটওয়ার্কগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রতিবাদ ছিল প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, তবে প্রায়ই তা আইস ও বর্ডার পেট্রল এজেন্টদের বাড়তি বেআইনি আচরণের মুখে পড়েছে।
শিকাগোয় ব্রডভিউ কেন্দ্রটি আইস ও বর্ডার পেট্রলের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ওই কেন্দ্রে নিয়মিত ধর্মীয় সেবা দিতে যাওয়া রেভারেন্ড ডেভিড ব্ল্যাক জানান, প্রার্থনা ও স্লোগান দেওয়ার সময় আইস ও সিবিপির ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ছিল ভয়ংকর। একবার এমনই এক সেবার সময়, ধর্মীয় পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা তিন ফেডারেল এজেন্টকে অনুতপ্ত হওয়ার আহ্বান জানানোর সময় হঠাৎ তাঁর মুখ, হাত ও শরীরে বিস্ফোরক মরিচগুঁড়ার গুলি ছোড়া হয়। প্রতিবেদনে নথিভুক্ত অসংখ্য মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে তিনিও একজন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গবেষকেরা চারটি স্থানে মোট ১৫৪ জনের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যা বিভিন্ন রাজনৈতিক, আইনি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন অভিবাসী গ্রুপের ওপর অভিবাসন প্রয়োগ অভিযানের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে সংস্থাটিকে সহায়তা করেছে। এর ভিত্তিতে সংস্থাটি সিদ্ধান্তে এসেছে, নথিভুক্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনগুলো বিচ্ছিন্ন স্থানীয় ঘটনা নয়, বরং তা বৃহত্তর জাতীয় প্যাটার্নেরই প্রতিফলন।
নাদিয়া দার বলেন, এই প্রশাসন অভিবাসীদের অপরাধী ও দানব হিসেবে চিত্রিত করার মাধ্যমে যে কষ্ট ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে, তা দেখে হৃদয়বিদারক লাগে। তবে তিনি আশাবাদও প্রকাশ করেন— জনগণ লক্ষ্যবস্তু হওয়া মানুষদের চারপাশে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে পিছু হটতেও বাধ্য করেছে। এই ‘আতঙ্কের রাজত্বের’ জন্য দায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং নিষ্ঠুরতা নয়, মানবাধিকার ও মর্যাদার ভিত্তিতে গড়া একটি অভিবাসন ব্যবস্থার জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
