ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অনেক দেশ যখন অভিবাসন ঠেকাতে সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ ও বহিষ্কার নীতি জোরদার করছে, তখন ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছে স্পেন। অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতির অংশ হিসেবে দেশটি বাংলাদেশিসহ প্রায় পাঁচ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) স্পেন সরকার এ ঘোষণা দেয়। দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘রাজকীয় ডিক্রি’ বা বিশেষ নির্বাহী আদেশ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর কোনো দীর্ঘ সংসদীয় বিতর্ক ছাড়াই এটি কার্যকর হবে।
এই পদক্ষেপকে শুধু নীতিগত পরিবর্তন নয়, বরং ইউরোপের কোনো একক দেশে নেওয়া অন্যতম বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। দীর্ঘদিন যাদের ‘অদৃশ্য’ শ্রমশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাদেরই স্পেনের উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলো।
একবিংশ শতাব্দীতে ইউরোপে আর কোনো দেশ এত বড় পরিসরে অভিবাসীদের বৈধতার সুযোগ দেয়নি। অতীতে ইতালি বা গ্রিস সীমিত আকারে কিছু খাতে অভিবাসী নিয়মিতকরণ করলেও, স্পেনের এই ডিক্রি গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে নির্মাণ, পর্যটন, কৃষি এবং হাই-টেক স্টার্টআপ—সব খাতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
এমনকি ২০০৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসে লুইস রদ্রিগেজ সাপাতেরোর সময়ের বহুল আলোচিত নিয়মিতকরণ কর্মসূচিকেও এই সিদ্ধান্ত ছাড়িয়ে গেছে।
এই ঘোষণায় বার্সেলোনা, মাদ্রিদ ও ভালেন্সিয়ার মতো শহরে বসবাসরত হাজার হাজার বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি পরিবার স্বস্তি পেয়েছে। ধারণা করা হয়, বর্তমানে স্পেনে ৫০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন আইনের ফলে ১৫ থেকে ২০ হাজার বাংলাদেশি সরাসরি উপকৃত হতে পারেন। পর্যটন, কৃষি ও খুচরা ব্যবসা খাতে কর্মরত এসব প্রবাসী এখন বৈধ শ্রমচুক্তি করতে পারবেন। পাশাপাশি তারা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং নির্বিঘ্নে দেশে পরিবার–পরিজনের কাছে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় পাঁচ লাখ ‘ছায়া শ্রমিক’ আনুষ্ঠানিক ও সুরক্ষিত নাগরিক জীবনে প্রবেশ করবেন।
স্পেন সরকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দেশটির কল্যাণ রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখতে বিপুল শ্রমশক্তির প্রয়োজন রয়েছে। পাঁচ লাখ অভিবাসীকে বৈধ করলে বছরে প্রায় দুই বিলিয়ন ইউরো কর ও সামাজিক নিরাপত্তা অনুদান সরকারি কোষাগারে যুক্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ডিক্রি বিশেষভাবে নির্মাণ শিল্প এবং বয়স্কদের যত্ন ও সেবা খাতের শ্রমিক সংকট কমাতে সহায়ক হবে। এসব খাতে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীরা আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ও তাঁর জোটসঙ্গী পদেমোস দলের এই ‘রাজকীয় ডিক্রি’কে অনেকেই রাজনৈতিক কৌশল হিসেবেও দেখছেন। সংসদীয় ভোট এড়িয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিরোধীদের বাধা দেওয়ার সুযোগ কমে গেছে। ফলে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তায় থাকা পাঁচ লাখ অভিবাসীর জন্য বৈধতার পথ দ্রুত খুলে যাচ্ছে।
