বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিতে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২৭, ২০২৬

আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকিতে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যকে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পারস্য উপসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী মোতায়েনের ঘোষণার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তেহরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইরানের ভূখণ্ড বা স্বার্থে কোনো হামলা হলে সেটিকে তারা ‘সর্বাত্মক যুদ্ধ’ হিসেবে বিবেচনা করবে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর একাধিক বহর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং ইরানে সম্ভাব্য হামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে ইরানের মিত্র ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠী কাতাইব হিজবুল্লাহ ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানে হামলা হলে তারা এটিকে আঞ্চলিক যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করে পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাবে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে সংঘাতের আগুনে ঠেলে দিতে পারে।

আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ পারস্য উপসাগরের দিকে এগোচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, একটি বড় মার্কিন নৌবহর উপসাগরীয় অঞ্চলের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এটি মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে।

ট্রাম্প প্রশাসনের ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ’ নীতির অংশ হিসেবে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ, প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও আকাশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েন করা হচ্ছে।

বিক্ষোভ ও প্রাণহানির দাবি

এদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানের মুদ্রার ব্যাপক দরপতনের পর তেহরানে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তা দ্রুত সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযান চালায় নিরাপত্তা বাহিনী।

ইরানের সরকারি সূত্রের দাবি, এসব সহিংসতায় তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল তাদের সম্পাদকীয় বোর্ডের পর্যালোচিত নথির বরাতে জানিয়েছে, গত ৮ ও ৯ জানুয়ারি দেশব্যাপী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে সাড়ে ৩৬ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। সংবাদমাধ্যমটি মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদন, চিকিৎসাকর্মী, প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সংখ্যা নিশ্চিত করেছে বলে দাবি করেছে।

সহিংসতার মধ্যে ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হলেও এখনো তা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ইউসুফ পেজেশকিয়ান দ্রুত ইন্টারনেট চালুর আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরান সরকার এই আন্দোলনকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ষড়যন্ত্র বলে দাবি করে আসছে। অপরদিকে আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে আসছে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব। এর মধ্যেই ইরানকে বারবার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ছে

ইরান সতর্ক করে বলেছে, তাদের ভূখণ্ড বা স্বার্থে হামলা হলে তার জবাব হবে ‘সবচেয়ে কঠিন’। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে আকাশপথের যোগাযোগেও বিঘ্ন দেখা দিয়েছে।

ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী কাতাইব হিজবুল্লাহর প্রধান আবু হুসাইন আল হামিদাওয়ি গত রোববার রাতে এক বিবৃতিতে যোদ্ধাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেন। তিনি বলেন, ইরানে হামলা কোনো মামুলি ঘটনা নয়; বরং এটি শত্রুদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে।

এ ছাড়া ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর করিডোর দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে নতুন করে হামলার হুমকি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে সামরিক হুমকি দেওয়ার পর সোমবার এই হুমকি দেয় গোষ্ঠীটি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁদের মতে, সামান্য ভুল হিসাব বা উসকানিও ভয়াবহ আঞ্চলিক সংঘাতের সূচনা ঘটাতে পারে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, ইরান ইন্টারন্যাশনাল