যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি যৌন অপরাধী ও ধনকুবের জেফরি এপস্টেইন–সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি প্রকাশ করেছে। প্রায় ৩০ লাখ পৃষ্ঠার এসব নথি, সঙ্গে এক লাখ ৮০ হাজার ছবি ও প্রায় দুই হাজার ভিডিও—সব মিলিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এপস্টেইনের অপরাধ, তার প্রভাবশালী যোগাযোগ এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার দীর্ঘ ইতিহাস নতুন করে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি কেড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই এপস্টেইন–সংক্রান্ত নথি প্রকাশের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রে চাপ তৈরি হচ্ছিল। ভুক্তভোগী, মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যমের আবেদনের প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে ধাপে ধাপে নথিগুলো প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনও চাপের মুখে পড়ে। এমনকি রিপাবলিকান পার্টির ভেতর থেকেও স্বচ্ছতার দাবি ওঠে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদনের পর আদালতের মাধ্যমে এপস্টেইন ফাইলসের একাধিক অংশ জনসমক্ষে আসে।
গত ৩০ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের যৌন নিপীড়ন–সংক্রান্ত তদন্তের সঙ্গে যুক্ত এসব নথি প্রকাশিত হয়। তদন্তকারীরা এপস্টেইনের বিভিন্ন সম্পত্তিতে অভিযান চালিয়ে ই-মেইল, যোগাযোগসংক্রান্ত দলিল, ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করেছিলেন। এসব তথ্য মিলিয়ে উঠে এসেছে একটি বিস্তৃত অপরাধ নেটওয়ার্কের চিত্র।
জেফরি এপস্টেইনের অপরাধের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডার পাম বিচে এক কিশোরীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে প্রথম বড় তদন্ত শুরু হয়। সে সময় প্রভাব খাটিয়ে প্রসিকিউটরদের সঙ্গে করা একটি আপিল চুক্তির মাধ্যমে তিনি বড় ধরনের সাজা এড়ান। তবে ওই ঘটনার পর থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত যৌন অপরাধী হিসেবে পরিচিত হন।
এর প্রায় এক দশক পর, ২০১৯ সালে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের দিয়ে যৌন ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে আবারও গ্রেপ্তার হন এপস্টেইন। বিচার শুরুর আগেই নিউইয়র্কের একটি কারাগারে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। সরকারিভাবে এটিকে আত্মহত্যা বলা হলেও, আদৌ তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছে—এ প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত।
নতুন করে আলোচনার আরেকটি বড় কারণ হলো প্রকাশিত নথিতে বিশ্বের প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তির নাম উঠে আসা। ফাইলগুলোতে ধনকুবের, রাজনীতিবিদ, বিনোদন জগতের তারকা ও রাজপরিবারের সদস্যদের নাম রয়েছে। এসব নামের সঙ্গে বিকৃত যৌন আচরণ, শিশু পাচার ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগের উল্লেখ থাকায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।
এই তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম থাকায় বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের রূপ নিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, ২০০৮ সালে এপস্টেইন প্রথমবার দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই তিনি তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং এপস্টেইনের কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তিনি জানতেন না।
সম্প্রতি হাউস ওভারসাইট কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা এপস্টেইন ও তার সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া কিছু ই-মেইল প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে ২০১১ সালের একটি ই-মেইলে ট্রাম্পের নাম উল্লেখ রয়েছে। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, সেখানে যে ভিক্টিমের কথা বলা হয়েছে তিনি ভার্জিনিয়া গিফ্রে। তবে গিফ্রে মৃত্যুর আগে জানিয়েছিলেন, তিনি ট্রাম্পকে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে দেখেননি। ফলে এখন পর্যন্ত প্রকাশিত নথিতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সরাসরি অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এপস্টেইনের সহযোগী হিসেবে ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েলের ভূমিকা ইতোমধ্যেই আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের পাচার ও যৌন নিপীড়নে সক্রিয়ভাবে সহায়তার দায়ে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন। এপস্টেইনের মালিকানাধীন লিটল সেন্ট জেমস দ্বীপে গড়ে ওঠা এই গোপন নেটওয়ার্ক পরিচালনায় ম্যাক্সওয়েল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
সর্বশেষ প্রকাশিত নথিতে আবারও উঠে এসেছে ইলন মাস্ক, বিল গেটস, যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রিন্স অ্যান্ড্রু, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিকের নাম। এর আগেও বিভিন্ন নথিতে এসব ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছিল। যদিও তাদের বিরুদ্ধে এখনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়নি, তবু এসব নথি জনমনে প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপস্টেইন ফাইলস কেবল একটি অপরাধের নথি নয়; এটি আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতা, প্রভাব এবং নৈতিকতার জটিল সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে অপরাধ আড়াল করতে পারেন, সেই বাস্তবতাও এই নথির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সূত্র: বিবিসি ও এএফপি
