একটি দেশেরও জন্মদিন থাকে। মানুষের মতো কেক কাটে না, মোমবাতি নেভায় না, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু দিন আছে, যেগুলো একটি জাতির আত্মপরিচয়। আমেরিকার জন্য ৪ জুলাই তেমনই একটি দিন। ১৭৭৬ সালের এই দিনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছিল। আড়াইশো বছর পরে, ২০২৬ সালে, সেই স্বাধীনতার ২৫০তম বর্ষপূর্তি উদযাপনের কথা ছিল সব আমেরিকানের উৎসব হিসেবে—ডেমোক্র্যাট, রিপাবলিকান, স্বতন্ত্র, সবাইকে নিয়ে।
কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, সেই জাতীয় উৎসব আর জাতীয় নেই। সেটি ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। আরও স্পষ্ট করে বললে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি পুরো উদযাপনটাই নিজের রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত করেছেন।
এই অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক বক্তৃতায় নয়, একটি ৫৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের ন্যাচারাল রিসোর্সেস কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্যরা বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছেন। শিরোনামটির বাংলা করলে দাঁড়ায়—‘অহংকার থেকে উন্মাদনা: হোয়াইট হাউস কীভাবে আমেরিকার মানুষকে তাদের ২৫০তম জন্মদিন থেকে বঞ্চিত করল।’
অভিযোগের শুরুটা ২০১৬ সালে। তখন কংগ্রেস রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের সমন্বয়ে ‘আমেরিকা ২৫০’ নামে একটি কমিশন গঠন করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ২০২৬ সালের স্বাধীনতার আড়াইশো বছর পূর্তি যেন দলীয় নয়, জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়।
কিন্তু ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফিরে এসে দেখলেন, সেই কমিশন তাঁর প্রত্যাশামতো পরিচালিত হচ্ছে না। তাঁর ঘনিষ্ঠদের সেখানে বসানোর সুযোগও সীমিত। এরপরই তৈরি হলো আরেকটি সংগঠন—‘ফ্রিডম ২৫০’।
নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে গঠিত এই প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি এলএলসি হিসেবে নিবন্ধিত হয়। এটি পরিচালিত হচ্ছে ন্যাশনাল পার্ক ফাউন্ডেশনের অধীনে। এর পরিচালনা পর্ষদে রয়েছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা, যাঁদের মধ্যে তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টারাও আছেন।
সংগঠনটি নিজেকে অদলীয় ও জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে পরিচয় দিলেও ডেমোক্র্যাটদের ভাষায় এটি আসলে হোয়াইট হাউসের ছায়া সংগঠন। এরপর শুরু হয় অভিযোগের তালিকা।
প্রথম অভিযোগ অর্থ নিয়ে। কংগ্রেস ১৫ কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়েছিল এই উদযাপনের জন্য। ধারণা ছিল, এর মধ্যে ১০ কোটি ডলার যাবে ‘আমেরিকা ২৫০’ কমিশনের কাছে। কিন্তু তাদের হাতে গেছে মাত্র আড়াই কোটি ডলার। বাকি অর্থের বড় অংশ বিভিন্নভাবে ‘ফ্রিডম ২৫০’ এবং ট্রাম্প প্রশাসন-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে চলে গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগ আরও গুরুতর। বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মনে করেছিলেন, তাঁরা সরকারি স্বীকৃত ‘আমেরিকা ২৫০’ কমিশনকে অনুদান দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের হাতে দেওয়া হয়েছিল ‘ফ্রিডম ২৫০’-এর ব্যাংক হিসাব। অর্থাৎ টাকা গেছে অন্য প্রতিষ্ঠানে। ডেমোক্র্যাটদের ভাষায়, এটি সম্ভাব্য আর্থিক প্রতারণা, যা ফেডারেল আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তৃতীয় অভিযোগ বিদেশি অর্থ সংগ্রহ নিয়ে। ‘ফ্রিডম ২৫০’-এর প্রধান নির্বাহী কিথ ক্র্যাক, যিনি ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক কর্মকর্তা, দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে বিভিন্ন দেশকে ‘ফ্রিডম ২৫০’-এর বিশেষ কর্মসূচিতে অংশ নিতে এবং তাদের প্যাকেজ কেনার আহ্বান জানান। অথচ সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করে, তারা বিদেশি অর্থ গ্রহণ করে না।
চতুর্থ অভিযোগটি নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে। অভিযোগ করা হয়েছে, বড় করপোরেট স্পনসরদের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও ছবি তোলার সুযোগ রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে প্রেসিডেন্টের কাছে যাওয়ার সুযোগ। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই আবার সরকারি চুক্তি, তহবিল বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয়।
পঞ্চম অভিযোগটি আরও রাজনৈতিক। ‘ইভেন্ট স্ট্র্যাটেজিস’ নামের যে প্রতিষ্ঠানটি ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির বিতর্কিত ট্রাম্প সমাবেশ আয়োজন করেছিল, সেই প্রতিষ্ঠানই এবার কোটি কোটি ডলারের সরকারি চুক্তি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের মতে, ট্রাম্প অনেক দিন ধরেই আমেরিকার ২৫০তম বর্ষপূর্তিকে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ করতে চেয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কুচকাওয়াজ তাঁর জন্মদিনে আয়োজন করা হয়। হোয়াইট হাউসে আয়োজিত বড় ক্রীড়া অনুষ্ঠানও তাঁর জন্মদিন ঘিরে। এমনকি ওয়াশিংটনে ২৫০ ফুট উচ্চতার একটি ‘বিজয় তোরণ’ নির্মাণের পরিকল্পনাও তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনার অংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই পরিকল্পনার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।
‘ফ্রিডম ২৫০’-এর বিভিন্ন অনুষ্ঠান নিয়েও বিতর্ক কম নয়। সমালোচকদের অভিযোগ, আমেরিকার বহুত্ববাদী ইতিহাসকে উপেক্ষা করে সেখানে অতিরিক্ত খ্রিস্টানকেন্দ্রিক ও একপেশে ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। একটি সংগীতানুষ্ঠানের শিল্পীরা যখন জানতে পারেন এটি নিরপেক্ষ অনুষ্ঠান নয়, তখন তাঁরা সরে দাঁড়ান। পরে সেটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক সমাবেশে রূপ নেয়।
এই প্রতিবেদন তৈরিতে দীর্ঘ সময় লেগেছে বলে জানিয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার কংগ্রেসম্যান জ্যারেড হাফম্যান। তাঁর দাবি, হুইসেলব্লোয়ারদের সাক্ষ্য, কংগ্রেসে দেওয়া জবানবন্দি এবং অভ্যন্তরীণ নথির ভিত্তিতেই এই প্রতিবেদন তৈরি হয়েছে।
হাফম্যানের অভিযোগ, একটি জাতীয় ঐক্যের অনুষ্ঠানকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রচারণায় পরিণত করা হয়েছে। জনগণের অর্থ দিয়ে রাজনৈতিক মিত্রদের সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তথ্য চাইতে গিয়ে তাঁরা বারবার বাধার মুখে পড়েছেন। ডেমোক্র্যাটরা ভবিষ্যতে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সমন জারি কিংবা ফৌজদারি তদন্তের সুপারিশও করতে পারেন বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অন্যদিকে ‘ফ্রিডম ২৫০’-এর মুখপাত্র ড্যানিয়েল আলভারেজ সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর ভাষায়, এগুলো সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং মিথ্যা। তিনি বলেছেন, বড় সব দাতা অর্থ দেওয়ার আগে স্পষ্টভাবে জানতেন তাঁরা কোন প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিচ্ছেন।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়। বড় করপোরেট দাতারা হয়তো বিষয়টি জানতেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ? তাঁরা কি নিশ্চিতভাবে বুঝেছিলেন, তাঁদের অনুদান সরকারি কমিশনে যাচ্ছে, নাকি একটি পৃথক এলএলসিতে?
জনস্বার্থবিষয়ক গবেষণা সংস্থার বিশ্লেষকেরা হিসাব করে বলছেন, এই উদযাপন উপলক্ষে ১২ কোটি ডলারেরও বেশি সরকারি অর্থ ব্যয় হয়েছে বা হচ্ছে। এর বড় অংশই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানের কাছে গেছে বলে তাঁদের দাবি।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা স্বচ্ছতা। ন্যাশনাল পার্ক ফাউন্ডেশনের দাতাদের পরিচয় প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক নয়। এলএলসি কাঠামোর আড়ালে কে কত দিলেন, কেন দিলেন, বিনিময়ে কী পেলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর জনসাধারণের জানার সুযোগ সীমিত।
আসলে পুরো বিতর্কটি অর্থের চেয়ে বড়। এটি রাষ্ট্রের চরিত্রের প্রশ্ন। ‘আমেরিকা ২৫০’ ছিল কংগ্রেসের সৃষ্টি। দ্বিদলীয়। জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক। আর ‘ফ্রিডম ২৫০’ একটি বেসরকারি করপোরেট কাঠামো, যেখানে স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা অনেক কম। এই পার্থক্যটুকুই আজকের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
দুইশো পঞ্চাশ বছর আগে আমেরিকা জন্ম নিয়েছিল একজন রাজা বা একজন মানুষের ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। আর সেই দেশের আড়াইশোতম জন্মদিনেই যদি জাতীয় উৎসবকে একজন রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডে রূপান্তরের অভিযোগ ওঠে, তাহলে ইতিহাস নিশ্চয়ই একটু মৃদু হেসে তাকাবে।
জন্মদিন তো হবেই। আতশবাজিও ফুটবে। জাতীয় পতাকা উড়বে। ট্রাম্প ভাষণ দেবেন। সমর্থকেরা হাততালি দেবেন। বিরোধীরা প্রতিবেদন লিখবেন। আর তারপর, হয়তো তদন্তও হবে। কারণ জন্মদিনের উৎসব এক দিনের। কিন্তু ইতিহাসের প্রশ্নের উত্তর একদিন না একদিন দিতেই হয়।
