বর্তমান সময়ে দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা এবং অল্প বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেশি। দীর্ঘদিন ধরে এর জন্য কেবল খাদ্যাভ্যাস বা অলস জীবনযাত্রাকেই দায়ী করা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক এপিজেনেটিক্স (Epigenetics—পরিবেশগত প্রভাবের কারণে জিনের প্রকাশভঙ্গির পরিবর্তন-সংক্রান্ত বিজ্ঞান) বিষয়ক গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ ও বেদনাদায়ক সম্ভাবনা। গবেষকেরা বলছেন, আধুনিক দক্ষিণ এশীয়দের এই স্বাস্থ্যঝুঁকির পেছনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের দুর্ভিক্ষ ও দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসংকটেরও প্রভাব থাকতে পারে।
ইতিহাসের সেই নির্মম ক্ষুধা যেন আমাদের জীববিজ্ঞানে এক ধরনের “জৈবিক স্মৃতি” রেখে গেছে।
ঔপনিবেশিক দুর্ভিক্ষ ও ১৯৪৩ সালের ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’
ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৬৫ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে একাধিক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ সংঘটিত হয়। ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন গবেষণায় বড় ধরনের দুর্ভিক্ষের সংখ্যা ভিন্নভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষ, যা ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামে পরিচিত। এই দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন বলে বহু গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের যুদ্ধকালীন নীতি খাদ্যসংকটকে আরও তীব্র করেছিল বলে বহু ইতিহাসবিদের মত। বাংলার লাখ লাখ মানুষ যখন খাদ্যের অভাবে ধুঁকে ধুঁকে মরছিল, তখন ব্রিটিশ প্রশাসনের নীতিগত ব্যর্থতা ও উদাসীনতা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
এপিজেনেটিক্স কী এবং কীভাবে এটি জিনের কার্যপ্রণালিকে প্রভাবিত করে?
সাধারণভাবে আমাদের শরীরের গঠন ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয় জিনের মাধ্যমে। কিন্তু চরম মানসিক চাপ, অপুষ্টি বা দীর্ঘস্থায়ী অনাহার জিনের মূল গঠন না বদলিয়েও তার কার্যপ্রণালিতে পরিবর্তন আনতে পারে। একেই বলা হয় এপিজেনেটিক্স।
অনাহারের সময় শরীর টিকে থাকার জন্য কিছু জৈবিক পরিবর্তন ঘটায়। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হলো ডিএনএ মিথাইলেশন (DNA Methylation), যেখানে ডিএনএর ওপর রাসায়নিক চিহ্ন (chemical markers) যুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট জিনের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে।
এর ফলে শরীরে কয়েকটি অভিযোজনমূলক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে—
চর্বি সঞ্চয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি: শরীর প্রতিটি ক্যালরি সংরক্ষণে সচেষ্ট হয় এবং বিশেষ করে পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে (ভিসেরাল ফ্যাট) চর্বি জমাতে শুরু করে।
বিপাকক্রিয়ার গতি কমে যাওয়া: কম শক্তি ব্যয় করে বেঁচে থাকার জন্য শরীরের মেটাবলিজম ধীর হয়ে যায়।
পেশীর ভর কমে যাওয়া: যেহেতু পেশী বেশি শক্তি ব্যয় করে, তাই শরীর তুলনামূলকভাবে কম পেশী তৈরি করে এবং বেশি চর্বি জমাতে থাকে।
কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই ধরনের এপিজেনেটিক পরিবর্তনের একটি অংশ পরবর্তী প্রজন্মেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এই আন্তঃপ্রজন্মগত প্রভাব কতটা স্থায়ী এবং কতটা বিস্তৃত—তা নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান।
আধুনিক যুগের ‘ভুল মানিয়ে নেওয়া’ (Evolutionary Mismatch)
যদি এই এপিজেনেটিক অভিযোজন সত্যিই প্রজন্মান্তরে প্রভাব ফেলে থাকে, তবে পূর্বপুরুষদের বাঁচিয়ে রাখার সেই জৈবিক কৌশল আজ উল্টো স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে। কারণ এখন আর দুর্ভিক্ষ নেই, কিন্তু শরীরের কিছু বিপাকীয় বৈশিষ্ট্য হয়তো এখনও সেই সংকটের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মতো আচরণ করছে।
এর ফলে দেখা দিতে পারে—
টাইপ-২ ডায়াবেটিস: দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি এবং অনেক ক্ষেত্রেই কম বয়সে এ রোগ দেখা যায়।
TOFI (Thin Outside, Fat Inside): অনেক দক্ষিণ এশীয় দেখতে রোগা হলেও শরীরের ভেতরে, বিশেষ করে পেটের অভ্যন্তরে, অতিরিক্ত চর্বি জমে থাকে এবং পেশীর পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হয়।
অল্প বয়সে হৃদরোগ: উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং ভিসেরাল ফ্যাট বৃদ্ধির কারণে দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে তুলনামূলক কম বয়সেই হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি দেখা যায়।
এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে, পূর্বপুরুষদের জীবন রক্ষার জন্য গড়ে ওঠা জৈবিক অভিযোজন আজ আমাদের স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে এটিও মনে রাখা জরুরি যে, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের জন্য জিন, এপিজেনেটিক্স, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, পরিবেশ এবং জীবনযাত্রা—সবগুলোই সম্মিলিতভাবে দায়ী। এপিজেনেটিক্স এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ক্ষেত্র হলেও, এটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক হবে না।
