মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি: কে জিতল এই সমঝোতায়?

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

মঙ্গলবার, জুন ২৩, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি: কে জিতল এই সমঝোতায়?

মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সাথে নৈশভোজের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এই চুক্তি ভার্সাইতে স্বাক্ষরিত হয়েছে।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত এই ১৪ দফা স্মারকলিপি অনুযায়ী, দুই পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তি সম্পাদনের অঙ্গীকার করেছে, যা পারস্পরিক সম্মতিতে বাড়ানো যাবে। চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর থাকা নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার শুরু করবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে এই অবরোধ সম্পূর্ণভাবে তুলে নেওয়া হবে। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ৬০ দিনের জন্য টোল-মুক্ত নিরাপদ পথ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেবে।

সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো অর্থনৈতিক প্যাকেজ। চুক্তিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে মিলে ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য অন্তত ৩০,০০০ কোটি ডলারের একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব, আইএইএ-র সিদ্ধান্ত এবং নিজস্ব সকল একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছে। পরমাণু ইস্যুতে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের নিষ্পত্তি হবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে, তবে এর সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি এখনও নির্ধারিত হয়নি।

ট্রাম্প নিজে এই চুক্তিকে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরেছেন। জি-৭ সম্মেলনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হলে হরমুজ প্রণালী খোলা সম্ভব হতো না এবং এর ফলে বিশ্ববাজারে এমন পতন ঘটত যা আগে কখনো দেখা যায়নি। প্রকৃতপক্ষে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেলের দাম ও জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমেরিকানদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান হামলার বিরুদ্ধে অসন্তোষ ছিল ব্যাপক, এবং এতে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক জনপ্রিয়তাও কমে গিয়েছিল, এমনকি তার নিজের সমর্থকদের মধ্যেও।

ফলে চুক্তি ঘোষণার পরপরই বাজারে স্বস্তির প্রতিফলন দেখা যায় — এস অ্যান্ড পি ৫০০ সূচক ১.৯ শতাংশ বেড়ে যায় এবং তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়। এই দিক থেকে দেখলে, ট্রাম্পের জন্য এই চুক্তি একটি স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বস্তি বয়ে এনেছে, বিশেষত ক্রমবর্ধমান জ্বালানি তেলের মূল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে আমেরিকান জনমতের চাপের মুখে।

তবে কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ওবামা প্রশাসনের ২০১৫ সালের জেসিপিওএ পরমাণু চুক্তিকে “সবচেয়ে খারাপ চুক্তি” বলে সমালোচনা করে এসেছেন এবং তার প্রথম মেয়াদে সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করিয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন কাঠামো চুক্তি ইরানকে এমন আর্থিক সুবিধা দিচ্ছে যা ওবামা-আমলের চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি সুবিধাজনক — যা সমালোচকদের কাছে এক ধরনের স্ববিরোধিতা বলে মনে হচ্ছে।

ইরানের পক্ষ থেকে চুক্তিটিকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলেছেন, ইরান এই চুক্তিকে একটি বিজয় হিসেবে দেখছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান চুক্তি স্বাক্ষরের পর সামাজিক মাধ্যমে এটিকে একটি ঐতিহাসিক দলিল এবং শক্তিশালী ইরানের পক্ষ থেকে একটি বার্তা বলে অভিহিত করেন, যেখানে তিনি বলেন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে পারস্পরিক সম্মানের ছায়ায়।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ছেলে মোজতাবা খামেনিও এই স্মারকলিপির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছেন বলে জানা গেছে। অর্থনৈতিকভাবে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো হিমায়িত সম্পদ মুক্তি এবং তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার — যা দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।

এই চুক্তিতে ইসরায়েল কোনো পক্ষ নয়, এবং তেল আবিবের পক্ষ থেকে সমালোচনার সুর স্পষ্ট। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইসরায়েলের সমালোচনার জবাবে বলেছেন, “ট্রাম্পই বিশ্বে তোমাদের একমাত্র মিত্র যিনি বাকি আছেন।” এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয় যে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরে এই চুক্তি নিয়ে কতটা অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অবশ্য জানিয়েছেন, তিনি ও ট্রাম্প এই বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং তারা সম্পূর্ণ একমত। তবে বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে — লেবাননে ইসরায়েলি অভিযান অব্যাহত রয়েছে, এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন তারা সেনা প্রত্যাহার করবেন না। হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘর্ষ যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও অব্যাহত রয়েছে। মূল চুক্তিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা মধ্যপ্রাচ্যে তার সহযোগী অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর (যেমন হিজবুল্লাহ) বিষয় অন্তর্ভুক্ত নয় — যা ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ। এই অসম্পূর্ণতাই ইসরায়েলি নেতৃত্বের অসন্তুষ্টির মূল কারণ।

দেশীয়ভাবে, এই চুক্তি নিয়ে আমেরিকার রাজনীতিতেও বিভাজন স্পষ্ট। ট্রাম্প নিজে চুক্তির সমালোচকদের কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেছেন, বলেছেন যারা এই চুক্তির বিরোধিতা করছে তারা “দুষ্কৃতিকারী, মূর্খ বা ঈর্ষাকাতর।” এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, রিপাবলিকান শিবিরের অভ্যন্তরেও এই চুক্তি নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।

প্রসঙ্গত, যুদ্ধ চলাকালীন জনমত জরিপে ধারাবাহিকভাবে দেখা গিয়েছিল আমেরিকানরা ইরানে মার্কিন হামলার বিরোধী ছিল, এবং এই অসন্তোষ ট্রাম্পের অর্থনৈতিক রেটিংয়ে স্পষ্ট প্রভাব ফেলেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের অবসান ও বাজারের স্থিতিশীলতা আমেরিকান জনমতের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও, ইরানের জন্য বিপুল আর্থিক সুবিধার প্রতিশ্রুতি অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে এই চুক্তি এখনও মূল বিরোধগুলোর সমাধান করেনি। বিশেষজ্ঞ এলিসা ইওয়ার্সের মতে, হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হয় সেটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের বিষয়, কারণ ইরান টোল আদায় না করতে সম্মত হলেও সার্ভিস ফি বা অন্যান্য পদ্ধতি আলোচনায় উঠে এসেছে।

সার্বিক বিচারে, এই চুক্তিতে স্বল্পমেয়াদে দুই পক্ষই কিছু লাভ দেখাতে পারছে — ট্রাম্প অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও যুদ্ধাবসানের কৃতিত্ব নিতে পারছেন, আর ইরান নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে মুক্তির প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। কিন্তু পরমাণু কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ — এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিত রয়ে গেছে, যা আগামী ৬০ দিনের আলোচনার ওপর নির্ভর করছে। প্রকৃত বিজয়ী কে হবে, তা নির্ধারিত হবে এই চূড়ান্ত আলোচনার ফলাফলেই।