শুক্রবার, ২১ আগষ্ট ২০২৬

হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন ভূখণ্ড’ দেখিয়ে ট্রাম্পের পোস্ট, ইরানের পাল্টা জবাব

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২৬

হরমুজকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতুন ভূখণ্ড’ দেখিয়ে ট্রাম্পের পোস্ট, ইরানের পাল্টা জবাব

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছেন, যেখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত এবং গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্টে এ মানচিত্র প্রকাশ করেন।

ট্রাম্পের পোস্টে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তবে এর আগে তিনি ইরানকে পরাজিত করার পর হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সর্বশেষ মানচিত্র প্রকাশের মাধ্যমে সেই অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ট্রাম্পের প্রকাশিত মানচিত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর ‘নিউ ইউএস টেরিটরি’ বা ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ লেখা দেখা যায়। এর কয়েক দিন আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন। একই সময়ে তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে মার্কিন অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে না।

ট্রাম্পের এই অবস্থানের তাৎক্ষণিক বিরোধিতা করেছে ইরান। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি ট্রাম্পের দাবিকে ‘ভ্রান্ত ধারণা’ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো প্রেসিডেন্টের ঘোষণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট কিংবা সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির আইনগত অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ। এর বিভিন্ন অংশ উপকূলবর্তী দেশগুলোর আঞ্চলিক জলসীমার সঙ্গে সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে কোনো রাষ্ট্র একতরফাভাবে একটি জলপথকে নিজের ভূখণ্ড ঘোষণা করলেই সেখানে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না। ফলে ট্রাম্পের মানচিত্রকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক আইন ও সামুদ্রিক অধিকারের প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ইরানের কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর উপকূলবর্তী দেশগুলোর অধিকার রয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফও জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের দাবি মেনে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু হবে না।

এদিকে হরমুজকে ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখানো মানচিত্র প্রকাশের একই সময়ে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা চলছে না এবং নতুন কোনো আলোচনাও নির্ধারিত হয়নি। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা কথোপকথন চলছে না। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছেন।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৬০ দিনের একটি সমঝোতা ও আলোচনার সময়সীমা ছিল। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এর পর দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আবারও বেড়েছে।

হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব মূলত এর ভৌগোলিক অবস্থান ও জ্বালানি পরিবহনের কারণে। পারস্য উপসাগর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী কোনো বাধা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এশিয়া, ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

বর্তমান সংঘাতের কারণে হরমুজ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলও ব্যাপকভাবে কমে গেছে। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে অনেক জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এই জলপথ এড়িয়ে চলছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তেল ও গ্যাসের আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়ে জ্বালানির দাম বাড়তে পারে। এর প্রভাব পরিবহন ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, খাদ্য সরবরাহ এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে।

বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় অর্থনীতিগুলো মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ইউরোপের বিভিন্ন দেশও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে হরমুজ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ট্রাম্পের মানচিত্র নিয়ে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়াও এসেছে ব্যঙ্গাত্মকভাবে। ইরানের একটি সরকারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াকে ইরানের ‘নতুন ভূখণ্ড’ হিসেবে দেখানো একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। সেখানে ক্যালিফোর্নিয়াকে ‘নিউ টেরিটরি অব ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ট্রাম্পের হরমুজকে মার্কিন ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো পোস্টের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ওই মানচিত্র প্রকাশ করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।

এদিকে হরমুজকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। দেশটির অভিযোগ, সামুদ্রিক এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের পর তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে ইরান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইরানের সামরিক কর্মকর্তারাও উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সহযোগিতা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত আঞ্চলিক পর্যায়ে আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্পের সর্বশেষ পোস্ট এবং ইরানের কঠোর প্রতিক্রিয়া দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাকেও আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ওয়াশিংটন ইরানের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলছে। অন্যদিকে তেহরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও জাহাজ চলাচলের বিষয়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করছে।

তবে ট্রাম্পের ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’ হিসেবে হরমুজকে চিহ্নিত করা মানচিত্র কোনো আইনগতভাবে স্বীকৃত ভূখণ্ড পরিবর্তন করেনি। কিন্তু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বন্দ্বের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল, সামুদ্রিক আইন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা।

ফলে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান সংকট এখন দুই দেশের সামরিক সংঘাতের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হবে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তত বাড়বে।