নিউইয়র্ক ও নিউজার্সির রাস্তায় চলছে এক নীরব ও ভয়াবহ অভিবাসন-বিরোধী অভিযান। সন্তানের জন্য দুধ কিনতে যাওয়া, কফি আনতে বেরোনো, কুকুর নিয়ে হাঁটতে যাওয়া কিংবা সন্তানকে ফুটবল প্র্যাকটিস থেকে আনতে যাওয়া—এই স্বাভাবিক মুহূর্তগুলো এখন হাজারো অভিবাসীর জীবনে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘দ্য সিটি’ এক হাজার ২০০ এর বেশি মামলার নথি পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, গত কয়েক মাসে এই অঞ্চলে অন্তত ৪৩০টি রাস্তায় গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। যেখানে ৯৩ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে লাতিনো অভিবাসীদের লক্ষ্য করা হয়েছে—অথচ এই অঞ্চলে বৈধ কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের মধ্যে লাতিনোদের অংশ মাত্র ৬৬ শতাংশ।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর আগে নিউইয়র্ক মহানগরে এই ধরনের রাস্তায় গ্রেফতার প্রায় ছিলই না। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় আইনজীবীরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, যুক্তি দিচ্ছেন যে এই গ্রেফতারগুলো সংবিধান লঙ্ঘন করছে। নিউইয়র্ক সিটিতেই ৮১টি রাস্তায় গ্রেফতারের ঘটনা চিহ্নিত করা হয়েছে। কুইন্সের করোনা এলাকায় সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে। লং আইল্যান্ডের ব্রেন্টউড ও হেমস্টেড থেকে শুরু করে নিউজার্সির প্যাসেইক ও প্লেইনফিল্ড পর্যন্ত লাতিনো অধ্যুষিত এলাকাগুলোই বারবার টার্গেট হয়েছে।
এই গ্রেফতার অভিযানের প্রকৃতি শুধু ভীতিকর নয়, বহু ক্ষেত্রে সরাসরি বেআইনি বলে অভিযোগ উঠছে। কিছু গ্রেফতারের বিবরণে দেখা গেছে, আইস এজেন্টরা বলেছেন যে তারা অন্য কাউকে ওয়ারেন্টসহ খুঁজছিলেন, কিন্তু পথে যাকে পেলেন তাকে দেখতে “মিল আছে” মনে হওয়ায় তাকেই গ্রেফতার করলেন। গুয়াতেমালার ফ্লোরেন্সিওর ঘটনাই এর একটি নির্মম উদাহরণ। ম্যানহাটনে রঙের কাজ শেষ করে করোনায় নিজের বাড়ির দিকে হাঁটছিলেন তিনি। মুখোশ পরা এজেন্টরা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলতে থাকলে তিনি ভেবেছিলেন অপহৃত হচ্ছেন। সেই মুহূর্তে তার স্ত্রী ফিদেলিনা তিন সন্তান নিয়ে বাজারে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন। তাদের ১৩ বছরের ছেলে চিৎকার শুনে মাকে বলল, “মা, এটা আইস।” ৯ বছরের ছোট ছেলে বাবাকে চিনতে পেরে ডেকে উঠল—আর সেই মুহূর্তে ফ্লোরেন্সিওকে মাটিতে ফেলে হাতকড়া পরিয়ে একটি অচিহ্নিত গাড়িতে তুলে নিয়ে গেল এজেন্টরা। পরে আইস নিজেই স্বীকার করেছে, তারা তাকে প্রথমে থামিয়েছিল কারণ তার “গড়ন ও চেহারা” অন্য একজনের সঙ্গে মেলে বলে মনে হয়েছিল—সেই “অন্যজন” ছিলেন ইকুয়েডরীয়, আর ফ্লোরেন্সিও গুয়াতেমালার নাগরিক, যিনি ১৩ বছর ধরে আমেরিকায় আছেন।
শুধু হাতকড়া নয়, বহু ক্ষেত্রে সহিংসতার অভিযোগও উঠেছে। দ্য সিটি ২৯টি ঘটনা চিহ্নিত করেছে যেখানে এজেন্টরা রাস্তায় গ্রেফতারের সময় বল প্রয়োগের অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে। এজেন্টরা টেজার ব্যবহার করেছেন, গাড়ির জানালা ভেঙেছেন, মানুষকে গাড়ি থেকে টেনে বের করেছেন এবং বর্ণবাদী গালিগালাজ করেছেন। ইকুয়েডরের ডিয়েগো তার গাড়িতে বসে ছিলেন যখন তিন এজেন্ট তাকে ঘিরে ধরে। রক্তাক্ত মুখ নিয়ে তাকে গাড়ি থেকে বের করতে হয়েছিল এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। ব্রংক্সে এক ২১ বছরের তরুণকে মাটিতে ফেলে একজন এজেন্ট ছয়বার টেজার দিয়ে শক দিয়েছেন বলে মামলার নথিতে উল্লেখ আছে, এবং সেই সময় এজেন্ট তাকে “মালদিতো মেক্সিকানো” অর্থাৎ “শালার মেক্সিকান” বলে গালি দিয়েছেন। তরুণটি পরে শপথনামায় লিখেছেন, “তখনই বুঝলাম, লোকটা আমাকে শুধু হিস্পানিক বলেই গ্রেফতার করেছে।”
গ্রেফতারের পর পরিবারগুলোর অবস্থা হয় আরও করুণ। ফ্লোরেন্সিওর স্ত্রী ফিদেলিনা স্বামীর জন্য আইনজীবী খুঁজতে গিয়ে একটি প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়লেন—হোয়াটসঅ্যাপে “বিনামূল্যে সাহায্যের” প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকারি সিল লাগানো নকল রসিদ পাঠিয়ে মোট ১৩ হাজার ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয় তার কাছ থেকে। এর মধ্যে ফ্লোরেন্সিওকে নিউইয়র্ক থেকে নিউজার্সি, তারপর টেক্সাস এবং শেষে নিউ মেক্সিকোতে স্থানান্তর করা হয়। বড়দিনে সন্তানরা ফোনে জিজ্ঞেস করল বাবা বাড়ি আসবেন কি না—কান্না আটকাতে গভীর শ্বাস নিয়েছিলেন তিনি। চার মাস পর মুক্তি পেয়ে ডিটেনশন সেন্টারের কাছের বিমানবন্দরে ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে—বাড়ি ফেরার ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক এলোরা মুখার্জি বলেছেন, “তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিত করছে যে সব নিউইয়র্কবাসী যা জানেন—আইস রাস্তা-গ্রেফতারে বর্ণভিত্তিক প্রোফাইলিং করছে।” তবে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এই অভিযোগ “ঘৃণ্য ও সম্পূর্ণ মিথ্যা” বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, কেউ আইন ভেঙে থাকলেই কেবল তাকে টার্গেট করা হয়—চামড়ার রং দেখে নয়।
এদিকে সানসেট পার্কে এলাকাবাসীরা গ্রেফতার হলে পরিচিতজনকে জানাতে পারেন বলে বাহুতে ফোন নম্বর মার্কার দিয়ে লিখে রাখছেন। চার্চে মানুষের উপস্থিতি কমে গেছে। দিনমজুরেরা কাজে যাচ্ছেন না। বোনেরা ভাইদের সারাদিন লোকেশন শেয়ার করতে বলছেন। স্টেটেন আইল্যান্ডে গ্রেফতার হওয়া হুয়ান, প্রায় দুই দশক আমেরিকায় থাকার পরেও বলছেন, “সত্যি বলতে, আমি ভয়ের মধ্যে হাঁটি।” আর ফিদেলিনার কথাগুলো যেন লাখো অভিবাসীর মনের কথা: “তাদের সব ক্ষমতা, সব কর্তৃত্ব। কতগুলো পরিবার তারা ধ্বংস করছে, সেটা তাদের কাছে কোনো ব্যাপারই না।”
