নিউ ইয়র্কের কুইন্সের ডাউনটাউন ফ্লাশিং একটি ১.৩ একরের পাবলিক প্লাজা বা “টাউন স্কয়ার” পাওয়ার পথে আরেক ধাপ এগিয়েছে। বহু দশক ধরে অপেক্ষায় থাকা ‘ফ্লাশিং কমন্স’ টাওয়ার প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই টাউন স্কয়ার তৈরি করা হচ্ছে। প্রকল্পটির ডেভেলপার ‘এফ অ্যান্ড টি গ্রুপ’ ইতোমধ্যে প্লাজা এবং তিনটি মিক্সড-ইউজ টাওয়ারের দ্বিতীয়টির নির্মাণকাজ শুরু করে দিয়েছে। এই ভবনগুলোতে একটি নতুন ওয়াইএমসিএ সেন্টার, শত শত কনডোমিনিয়াম ইউনিট এবং হাজার হাজার বর্গফুটের খুচরা ব্যবসা ও অফিসের জায়গা থাকবে।
২০১০ সালে সিটি কাউন্সিল যখন ফ্লাশিং কমন্স প্রকল্পের অনুমোদন দেয়, তখন ডেভেলপার এবং শহরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকর্তারা এটিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি বড় মাধ্যম হিসেবে প্রচার করেছিলেন। শহরতলীর সবচেয়ে ব্যস্ততম ফ্লাশিং-মেইন স্ট্র্রিট ট্রেন স্টেশনের কাছে অবস্থিত হওয়ায়, এই প্রকল্প হাজার হাজার কর্মসংস্থান তৈরি এবং এলাকাটিকে একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
তবে ২০১০ সালের পর থেকে প্রধানত এশীয় মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের এই এলাকার চিত্র বেশ বদলে গেছে। এলাকাটিতে একের পর এক বিলাসবহুল হাই-রাইজ কনডো তৈরি হওয়ায় অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া এবং বিক্রির দাম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
‘স্ট্রিটইজি’-র তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালে যেখানে ফ্লাশিংয়ে একটি বাড়ির গড় বিক্রি মূল্য ছিল $৩৫০,০০০ ডলার, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় $৬৫০,০০০ ডলারে।ফ্লাশিংয়ের গড় পারিবারিক আয় $৬৯,০০০ ডলার, যা পুরো শহরের গড় আয়ের ($৮৫,০০০ ডলার) চেয়ে কম।
আর্বান ডিসপ্লেসমেন্ট প্রজেক্টের এক ২০১৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্লাশিংয়ের বেশ কিছু ব্লকে কম আয়ের পরিবারগুলোর স্থানচ্যুতি ঘটছে এবং জেন্ট্রিফিকেশন চলছে।
প্রকল্পটি মূলত শহরের মালিকানাধীন জমিতে নির্মিত হচ্ছে, যা বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে ডেভেলপারদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এখানে কোনো সাশ্রয়ী মূল্যের আবাসন না থাকায় তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
ফ্লাশিং কমন্সে কনডোর শুরুর দাম রাখা হয়েছে প্রায় $১ মিলিয়ন (১০ লাখ) ডলার।
সমালোচকদের মতে ফ্লাশিং কমন্স “অসম উন্নয়নের ক্ষত” এবং ডাউনটাউন ফ্লাশিংয়ের জেন্ট্রিফিকেশনের “অনুঘটক”।
অবসরপ্রাপ্ত ‘কিউনি’ প্রফেসর ট্যারি হাম এই প্রকল্পকে শুরু থেকেই একটি “স্বার্থান্বেষী উপহার” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, “তারা এমন একটি এলাকা তৈরি করছে যা বিশ্বব্যাপী ধনী অভিজাতদের চাহিদা মেটাবে। মনে হচ্ছে তারা কুইন্সের বুকে সাংহাই তৈরি করতে চাইছে।”
এ প্রসঙ্গে কমিউনিটি বোর্ড চেয়ার চাক অ্যাপেলিয়ান নিজেই স্বীকার করেছেন, “এটা একটা অন্য জগৎ। আজকের দিনে সাশ্রয়ী আবাসন ছাড়া কোনো আপজোনিং হতোই না।”
তিনি জানান, প্রকল্পটির সাথে কাছেই ১৪০ ইউনিটের একটি সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রফেসর হাম একে শুরু থেকেই “দান করে দেওয়া” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
এই জমির ইতিহাসও বিতর্কিত। ২০ শতকের মাঝামাঝি নগর পরিকল্পনাবিদ রবার্ট মোজেস “স্লাম ক্লিয়ারেন্স” পরিকল্পনার নামে এখান থেকে একটি কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করে শহরের প্রথম মিউনিসিপ্যাল পার্কিং লট বানিয়েছিলেন বলে নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে।
২০০৪ সালে ব্লুমবার্গ প্রশাসন এই পার্কিং লটকে বদলে ফ্লাশিংয়ের ডাউনটাউন, ওয়াটারফ্রন্ট এবং উইলেটস পয়েন্টকে পুনর্নির্মাণের তিন-অংশের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফ্লাশিং কমন্সের ধারণা আনে।
পাবলিক প্লাজা বা গণপরিসরের মান নিয়েও স্থানীয়দের মনে সংশয় রয়েছে। কমিউনিটি বোর্ড সদস্য ও শিল্পী কোডি হারম্যান বলেন, এই ডেভেলপারদের তৈরি আগের অনেক ব্যক্তিমালিকানাধীন পাবলিক স্পেসই সফল হতে পারেনি।
তবে ডেভেলপার গোষ্ঠী এবং এশিয়ান আমেরিকানস ফর ইকুয়ালিটির-মতো সংস্থার প্রতিনিধিরা ইতিবাচক সম্ভাবনাও দেখছেন। এএএফই-এর নির্বাহী পরিচালক থমাস ইউ জানান, অনেক ছোট ব্যবসা ও বাসিন্দা সাশ্রয়ী আবাসন নিয়ে চিন্তিত হলেও নতুন উন্নয়নকে স্বাগত জানাচ্ছেন চাকরি ও অর্থনৈতিক সুযোগের আশায়। তার মতে, বাজার পরিস্থিতি বদলাচ্ছে এবং ডেভেলপাররা এখন বুঝতে পারছেন যে শুধু আন্তর্জাতিক অর্থের ওপর ভর করে বিলাসবহুল কন্ডো বানানো টেকসই নয়, তাই সাশ্রয়ী আবাসনের দিকে ঝোঁকার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
