যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের একটি ফেডারেল আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একটি অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দিয়েছেন। তবে এ রায় সরাসরি বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য প্রযোজ্য নয়। তবু অভিবাসন-সংশ্লিষ্ট আইনি লড়াইয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত ৬ জুলাই ওহাইওর কলাম্বাসে ফেডারেল জেলা বিচারক আলজেনন এল. মার্বলি ট্রাম্প প্রশাসনের একটি নীতির বিরুদ্ধে প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা (প্রিলিমিনারি ইনজাংশন) জারি করেন। মামলাটি করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে বসবাসরত ২৫ জন অভিবাসী। তাঁদের অভিযোগ, ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস (ইউএসসিআইএস) জন্মস্থানের ভিত্তিতে তাঁদের কর্মসংস্থানের অনুমতি, গ্রিন কার্ডসহ বিভিন্ন অভিবাসন-সুবিধার আবেদন অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রেখেছে।
৬৯ পৃষ্ঠার রায়ে বিচারক বলেন, এ মামলার প্রশ্ন প্রেসিডেন্টের বিদেশি নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ সীমিত করার সাংবিধানিক ক্ষমতা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ইউএসসিআইএস আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে এমন নীতি গ্রহণ করতে পারে কি না, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থানরত ব্যক্তিদের আবেদন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয় এবং তাঁদের জাতীয়তাকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নেতিবাচক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রায়ে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে বিচারিক পর্যালোচনা এড়ানোর সরকারি অবস্থানও প্রত্যাখ্যান করেন বিচারক। তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিচারিক পর্যালোচনা এড়ানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
বিচারক তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন, ক্যালিফোর্নিয়া, ম্যাসাচুসেটস, আরকানসাস, মেরিল্যান্ড, ইন্ডিয়ানাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আদালত একই ধরনের নীতির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে অনুরূপ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সম্প্রতি রোড আইল্যান্ডের একটি আদালতও এ ধরনের নীতিকে বেআইনি বলে রায় দিয়েছেন।
রায়ের একাংশে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অতীতের কিছু বক্তব্যও উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে আফ্রিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকা ও এশিয়ার অভিবাসীদের নিয়ে দেওয়া মন্তব্য এবং ওহাইওর স্প্রিংফিল্ডে হাইতিয়ান অভিবাসীদের নিয়ে বিতর্কিত দাবির প্রসঙ্গ সেখানে এসেছে। তবে বিচারক স্পষ্ট করেছেন, এসব বক্তব্য তাঁর সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি নয়। রায়টি মূলত প্রশাসনিক পদ্ধতি আইন (অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসিডিউর অ্যাক্ট) এবং অভিবাসন আইনের আলোকে ইউএসসিআইএসের ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের প্রশ্নে দেওয়া হয়েছে।
মামলার বাদীরা মিয়ানমার, কানাডা, ইরান, নাইজেরিয়া, সিরিয়া, তানজানিয়া ও ভেনেজুয়েলার নাগরিক। তাঁদের মধ্যে হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট, নিবন্ধিত নার্স, ক্যানসার গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও প্রকৌশলী রয়েছেন।
তবে আদালতের এ আদেশ কেবল মামলার ২৫ জন বাদীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অর্থাৎ মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে ওই নীতি প্রয়োগ করতে পারবে না সরকার। একই সঙ্গে আদালত সরকারকে ৩০ দিনের মধ্যে নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলেছেন।
রায় ঘোষণার পর এখনো ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে আপিলের ঘোষণা দেয়নি। তবে আইনি বিশ্লেষকদের ধারণা, সরকার ষষ্ঠ সার্কিট কোর্ট অব আপিলে এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে পারে। একই ধরনের নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন আদালতে আরও একাধিক মামলা বিচারাধীন। এর মধ্যে বোস্টনের একটি মামলায় প্রায় ২০টি দেশের ২০০ জন অভিবাসীর পক্ষে আদালত একই ধরনের নীতিকে বৈষম্যমূলক ও বেআইনি বলে মত দিয়েছেন।
বাংলাদেশিদের জন্য এর অর্থ কী
ওহাইওর এ মামলার বাদীরা মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষিত ৩৯টি দেশের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিক। ইরান, সিরিয়া ও মিয়ানমার সেই তালিকায় থাকলেও বাংলাদেশ নেই।
তবে বাংলাদেশ অন্য একটি নীতির আওতায় রয়েছে। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ‘পাবলিক চার্জ’–সংক্রান্ত কারণে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের নতুন অভিবাসী ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়েছে। বাংলাদেশও ওই তালিকায় রয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্ত শুধু নতুন অভিবাসী ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পর্যটন, শিক্ষার্থী বা কর্মসংস্থানভিত্তিক নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়।
সে কারণে ওহাইওর সাম্প্রতিক রায় বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো আইনি সুবিধা তৈরি করছে না। তবে জাতীয়তার ভিত্তিতে অভিবাসন-সুবিধা সীমিত করার নীতির বিরুদ্ধে আদালতগুলোর ধারাবাহিক অবস্থান ভবিষ্যতে একই ধরনের নীতির বিরুদ্ধে নতুন আইনি চ্যালেঞ্জের পথ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
