শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পঃ নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

বৃহস্পতিবার, জুন ২৫, ২০২৬

ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পঃ নিহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা

বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ছয়টার কিছু পরে ভেনেজুয়েলার উত্তর উপকূলে একের পর এক দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ব্যবধানে আসা এই দুটি কম্পনে রাজধানী কারাকাসে বহু ভবন ধসে পড়েছে, হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় বেরিয়ে এসেছেন এবং দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে।

মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.২, যার কেন্দ্র ছিল কারাকাস থেকে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপে শহরের কাছে। এর ঠিক ৪০ সেকেন্ড পরেই ৭.৫ মাত্রার আরেকটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে ইউমারে শহরের কাছে।

ইউএসজিএস সতর্ক করে বলেছে, এই দুর্যোগে শেষ পর্যন্ত ১০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে। সংস্থাটি বলেছে, “ব্যাপক প্রাণহানি ও বিস্তৃত ক্ষয়ক্ষতি প্রায় অনিবার্য।” ইউএসজিএস এই দুটি ভূমিকম্পের জন্য পৃথকভাবে সর্বোচ্চ মাত্রার ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করেছে। সাধারণত বছরে মাত্র এক বা দুইবার এ ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়।

ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ জাতীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এবং সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। তিনি সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানাননি। রাজধানীর একটি এলাকার মেয়র জানিয়েছেন, সেখানে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন।

কারাকাসের সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। উপকূলীয় রাজ্য লা গুয়াইরায় অন্তত ১৫টি ভবন ধসে পড়েছে বলে জানা গেছে।

কারাকাসের একটি শপিং সেন্টারের উপরতলায় থাকা দোকানি হেইডি রোমেরো বলেন, “বিশ্বাসই হচ্ছিল না। কতক্ষণ ধরে কাঁপছিল বুঝতেই পারছিলাম না।” ৬৯ বছর বয়সী কারমেন গুয়েদেজ বলেন, “কাঁপতে শুরু করল, আস্তে আস্তে আরও জোরে। জানালাগুলো নড়তে দেখলাম, তারপর সব কিছু একসাথে।”

চতুর্থ তলার বাসিন্দা আম্পারো দিয়াজ বলেন, “মাটির ভেতর থেকে গর্জন শুনতে পেলাম। মনে হলো পানির মধ্যে ভাসছি।” তাঁর রান্নাঘর ধসে গেছে। সেই রাত তিনি রাস্তায় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আশি বছর বয়সী মানুয়েল গেভারা বারো, যিনি ১৯৬৭ সালের ভূমিকম্পও দেখেছেন, বললেন, “এর সাথে কোনো তুলনাই হয় না। এটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।”

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূপদার্থবিদ বাশান রাইট বলেন, ক্যারিবিয়ান প্লেট ও দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ভেনেজুয়েলা এমনিতেই ভূমিকম্পপ্রবণ। কারাকাস শহর একটি গভীর পললভূমিতে অবস্থিত, যা ভূকম্পনের তরঙ্গ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “আমি সরকারের সকল সংস্থাকে দ্রুত সহায়তার জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছি।” মেক্সিকো, ব্রাজিল, বলিভিয়াসহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সরকার সংহতি জানিয়েছে।

এই ভূমিকম্প এমন এক সময়ে আঘাত হেনেছে যখন ভেনেজুয়েলা গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে নিমজ্জিত। সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এ বছরের শুরুতে মার্কিন বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর দেশটি একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা মুদ্রাস্ফীতিতে জর্জরিত দেশটির অর্থনীতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত।

উদ্ধার অভিযান রাতভর অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। নিহত ও আহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।