লোহিত সাগরকে ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বে ১৪ দেশের একটি বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগ এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তাকাঠামোয় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নতুন এই জোট কার্যকর হলে নিরাপত্তা, সংঘাত মোকাবিলা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে স্থানীয় দেশগুলোর ভূমিকা আরও বাড়তে পারে। তবে সামরিক সক্ষমতা ও বড় কৌশলগত সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আপাতত বহাল থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
গত ৩০ জুলাই সৌদি রাজধানী রিয়াদে জোটটির প্রতিষ্ঠার ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জোটের স্থায়ী সদর দপ্তর, সমন্বিত কমান্ড কাঠামো, যৌথ কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, সামুদ্রিক অভিযান কেন্দ্র এবং স্থায়ী সচিবালয় সৌদি আরবে স্থাপন করা হবে।
তবে জোটটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হয়নি। কোন দেশ কত সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অংশ নেবে, সংকটের সময় কীভাবে যৌথ অভিযান পরিচালিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যুক্ত হবে কি না, এসব বিষয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে আপাতত উদ্যোগটিকে একটি রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
নতুন জোটের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো সৌদি আরব ও মিসরের অংশগ্রহণ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে লোহিত সাগরের নিরাপত্তায় ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’ চালু হলেও সৌদি আরব ও মিসর তাতে যোগ দেয়নি। এবার দুই দেশই নতুন সামুদ্রিক জোটের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলো নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগে অংশ নেওয়ার পরিবর্তে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে চাইছে। অর্থাৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তার দায়িত্বে স্থানীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর একটি প্রবণতা স্পষ্ট হচ্ছে।
লোহিত সাগরকেন্দ্রিক এই উদ্যোগকে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অন্যান্য প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ২০২৫ সালে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়। এরপর তুরস্ক ও মিসরের মধ্যে সামরিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত ৭ আগস্ট মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার একটি নতুন কাঠামো নিয়েও সমঝোতায় পৌঁছায়। পাশাপাশি সৌদি আরব, পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্ককে নিয়ে ‘আর৪’ নামে একটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামোও গড়ে উঠেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো প্রচলিত একক ও কঠোর সামরিক জোটের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন ও স্বার্থভিত্তিক একাধিক সহযোগিতার কাঠামোর দিকে এগোচ্ছে। অর্থাৎ, সব দেশের জন্য একই ধরনের সামরিক জোটের বদলে নির্দিষ্ট হুমকি বা ইস্যুতে নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশ একসঙ্গে কাজ করছে।
লোহিত সাগরে হুথিদের তৎপরতাকে নতুন সামুদ্রিক জোট গঠনের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে হুথিদের হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট এবং পশ্চিমা বাণিজ্যিক জাহাজ। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে এসব তৎপরতার প্রভাব সৌদি আরবের অর্থনৈতিক স্বার্থেও পড়তে শুরু করেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি অংশ লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে পরিচালনার প্রয়োজন বাড়ছে। ফলে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি ও অর্থনীতির জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এর পাশাপাশি বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বা জাহাজ থেকে সম্ভাব্য ফি আদায়ের আশঙ্কাও উদ্বেগ তৈরি করছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে কোনো রাষ্ট্রের বাইরে থাকা সশস্ত্র গোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে লোহিত সাগরকেন্দ্রিক নতুন সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটকে কেবল একটি সামরিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। এটি মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতারও প্রতিফলন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও প্রভাব এ অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেও সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে চাইছে।
তবে এই নতুন জোট বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। সদস্য দেশগুলোর সামরিক অবদান, যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং সংকটের সময় পারস্পরিক সহযোগিতার ধরন স্পষ্ট হওয়ার পরই বোঝা যাবে, লোহিত সাগরকে ঘিরে সত্যিই নতুন কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তাকাঠামোর জন্ম হচ্ছে কি না। একই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট হবে, এটি কেবল একটি সীমিত সামুদ্রিক উদ্যোগ, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা।
