শনিবার, ০৯ মে ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

শুক্রবার, মে ৮, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতা ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে

ইন্টারন্যাশনাল উইমেন’স মিডিয়া ফাউন্ডেশন (আইডব্লিউএমএফ) প্রকাশিত “সেফ টুগেদার: বিল্ডিং কমিউনিটি অ্যামিড এক্সপ্যান্ডিং থ্রেটস টু ইউএস জার্নালিস্টস” শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকরা বর্তমানে শারীরিক, ডিজিটাল ও আইনি হুমকির এক জটিল ও ক্রমবর্ধমান পরিবেশে কাজ করছেন। ২০২৫ সালে দেশটিতে তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থার অবনতি এবং শারীরিক ও ডিজিটাল ঝুঁকির বিস্তারের মধ্যে সাংবাদিকরা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

আইডব্লিউএমএফের নিউজরুম সেফটি অ্যাক্রস আমেরিকা (এনএসএএ) উদ্যোগের আওতায় পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপে ছয়টি অঙ্গরাজ্যের মোট ১৬৩ জন সাংবাদিক অংশগ্রহণ করেন। জরিপে দেখা যায়, ১৬১ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৩০ শতাংশ কর্মরত অবস্থায় শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন — যার মধ্যে হয়রানি, সরঞ্জাম চুরি বা বাজেয়াপ্ত করা, বেআইনি আটক, শারীরিক আঘাত এবং মৃত্যুর হুমকি অন্তর্ভুক্ত। একইভাবে, ১১৭ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৩০ শতাংশ ডিজিটাল হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন, যেখানে অনলাইন নির্যাতন, হ্যাকিং প্রচেষ্টা, পরিচয় চুরি ও ডিভাইস তল্লাশির ঘটনা রয়েছে। এ ছাড়া ১৩৬ জন উত্তরদাতার ১৭ শতাংশ আইনি হুমকির মুখে পড়েছেন, যেমন রিপোর্ট পরিবর্তনের চাপ, মামলা, নজরদারি, ডিভাইস বাজেয়াপ্ত এবং নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশে বাধা।

সাংবাদিকদের কর্মক্ষেত্রের বৈচিত্র্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনীতি (৫০%), সংস্কৃতি (৪৬%), সামাজিক ন্যায়বিচার (৪৬%) এবং শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয়ে রিপোর্ট করা সাংবাদিকরাই বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তবে প্রতিবেদনটি বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে যে বিপদ এখন আর শুধু ঐতিহ্যবাহী “ঝুঁকিপূর্ণ বিট” যেমন যুদ্ধ বা অপরাধ সংবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিয়মিত নাগরিক সভার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েও একজন সাংবাদিক ব্যাপক অনলাইন হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিক্ষোভ কভারেজ এখন সাংবাদিকদের জন্য একটি বিশেষ ঝুঁকির ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সাংবাদিক প্রেস পরিচয় স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কথা জানিয়েছেন। একজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, ফেডারেল এজেন্টরা জনতা নিয়ন্ত্রণের নামে টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করলে তিনি প্রেসের অংশ হিসেবে স্পষ্টভাবে পরিচিত থাকা সত্ত্বেও সেই গ্যাসের কবলে পড়েন। ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মাটিতে ছুঁড়ে ফেলা, চশমা ভাঙা, লাঠি দিয়ে আঘাত, সরঞ্জাম কেড়ে নেওয়া এবং কাছ থেকে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ।

ডিজিটাল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রতিবেদনটি উদ্বেগজনক একটি চিত্র তুলে ধরেছে। ১৩৩ জন উত্তরদাতার মধ্যে মাত্র ৩৩ শতাংশ তাদের নিউজরুম বা ক্লায়েন্টের মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ পান। অর্থাৎ বেশিরভাগ সাংবাদিক ডিজিটাল হুমকির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই লড়াই করছেন। একজন সাংবাদিক বলেন, সাইবার আক্রমণের মুখোমুখি হলে নিউজরুমের কেউ তাদের পাশে দাঁড়ায় না এবং সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের জন্য দর্শকদের সামনে সাংবাদিকরাই “পাঞ্চিং ব্যাগ” হয়ে যান।

বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের সময়কালে সাংবাদিকদের, বিশেষত নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিক ক্যাথরিন লুসেকে অবমাননাকরভাবে “চুপ থাকতে” বলেন এবং নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক কেটি রজার্সকে সোশ্যাল মিডিয়ায় তৃতীয় শ্রেণির বলে অভিহিত করেন। আইডব্লিউএমএফের মতে, এ ধরনের আক্রমণ সংবাদমাধ্যমের প্রতি বৈরিতাকে স্বাভাবিক করে তোলে, সাংবাদিকদের জবাবদিহিতামূলক ভূমিকাকে দুর্বল করে এবং সংবাদ স্বাধীনতার প্রতি জনআস্থা ক্ষুণ্ণ করে।

এই প্রেক্ষাপটে আইডব্লিউএমএফ ২০২৫ সালে ১,৫৭৯ জন সাংবাদিককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে, ১০৩ জনকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পরামর্শ দিয়েছে এবং ৬১ জনকে জরুরি আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। এনএসএএ উদ্যোগের অধীনে ছয়টি অঙ্গরাজ্যে আট দিনব্যাপী নিরাপত্তা কর্মশালা পরিচালিত হয়েছে, যেখানে ১৯৪ জন সাংবাদিক অংশ নিয়েছেন। প্রতিবেদনটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা রক্ষা শুধু ব্যক্তিগত প্রস্তুতির বিষয় নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। সংবাদমাধ্যম সংস্থা, প্রেস স্বাধীনতা গোষ্ঠী ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া একটি মুক্ত ও ভয়মুক্ত সংবাদমাধ্যম নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।