যে মানুষটি একটি বিলবোর্ড কোম্পানি থেকে শুরু করে টেলিভিশন সংবাদের ইতিহাস পাল্টে দিয়েছিলেন, সেই টেড টার্নার চলে গেলেন। বিশ্বের প্রথম চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল সিএনএনের প্রতিষ্ঠাতা, মিডিয়া মোগল ও দানবীর টেড টার্নার ৮৭ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন। ৬ মে, বুধবার টার্নার এন্টারপ্রাইজের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ফ্লোরিডার টালাহাসিতে তিনি পরিবার-পরিজনে ঘেরা অবস্থায় শান্তিপূর্ণভাবে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ওহাইওতে জন্মগ্রহণকারী এই আটলান্টার ব্যবসায়ীকে তাঁর বাচাল স্বভাবের কারণে “দ্য মাউথ অব দ্য সাউথ” বলা হতো। ২০১৮ সালে তাঁর ৮০তম জন্মদিনের কিছু আগে টার্নার জানিয়েছিলেন, তিনি লুই বডি ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। ২০২৫ সালের শুরুতে নিউমোনিয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হলেও পরে সুস্থ হন। তিনি পাঁচ সন্তান, চৌদ্দ নাতি-নাতনি এবং দুই প্রপৌত্র-প্রপৌত্রী রেখে গেছেন।
মাত্র ২৪ বছর বয়সে বাবার আত্মহত্যার পর শোক বুকে চাপা দিয়ে টার্নার হাতে নেন টার্নার আউটডোর অ্যাডভার্টাইজিং নামের বিলবোর্ড কোম্পানি। অন্যের পণ্য প্রচারের চেয়ে নিজে বড় কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে তিনি রেডিও স্টেশন কেনেন, তারপর ১৯৭০ সালে আটলান্টার একটি জনপ্রিয়তাহীন চ্যানেল — চ্যানেল ১৭ — অধিগ্রহণ করেন। পুরোনো সিটকম ও ক্লাসিক চলচ্চিত্র সম্প্রচার করে দর্শক টানার চেষ্টা করেন, এমনকি নিজেই একসময় “অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড থিয়েটার” অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন। তখনও সংবাদে তাঁর আগ্রহ ছিল না — তিনি বরং বিনিয়োগ করেন খেলাধুলায়, কিনে নেন আটলান্টা ব্রেভস বেসবল দলের সম্প্রচার স্বত্ব। ১৯৭৬ সালে চ্যানেল ১৭-এর সংকেত স্যাটেলাইটে পাঠিয়ে কেবল টিভির প্রথম সুপারস্টেশন তৈরি করেন তিনি, যা পৌঁছে যায় দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ কেবল গ্রাহকের কাছে।
সুপারস্টেশন গড়ার পর তাঁর দৃষ্টি যায় আরও উঁচুতে — একটি চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলের দিকে। তৎকালীন সম্প্রচার টিভি ও প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের প্রতি টার্নার ছিলেন তীব্র সমালোচক। তাঁর বিশ্বাস ছিল, আমেরিকানদের সমস্যার অন্যতম কারণ তাদের অজ্ঞতা, আর সেই অজ্ঞতা দূর করতে পারে কেবল একটি সত্যিকারের সংবাদমাধ্যম। অনেকেই তাঁর ধারণাটিকে পাগলামি মনে করেছিলেন। কিন্তু টার্নার একটি বাস্তব সুযোগ দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি বলতেন, “আমি সাতটায় বাড়ি ফিরতাম, তখন খবর শেষ হয়ে যেত। আমি মনে করলাম, আমার মতো আরও অনেকে আছেন।” ১৯৮০ সালের ১ জুন সিএনএন চালু হয় — পৃথিবীর প্রথম চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেল, যা আজও নিরবচ্ছিন্নভাবে সম্প্রচারিত হয়ে চলেছে।
এরপর একে একে যুক্ত হয় সিএনএন২ (পরে এইচএলএন), সিএনএন ইন্টারন্যাশনাল, টার্নার নেটওয়ার্ক টেলিভিশন (টিএনটি), টার্নার ক্লাসিক মুভিজ (টিসিএম) এবং কার্টুন নেটওয়ার্ক। ১৯৯০ সালে পারস্য উপসাগরীয় যুদ্ধ সরাসরি সম্প্রচার করে সিএনএন প্রমাণ করে দেয়, একটি চব্বিশ ঘণ্টার সংবাদ চ্যানেলের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম — সেই যুদ্ধের সরাসরি সম্প্রচার একমাত্র সিএনএনেই ছিল। ১৯৯১ সালে টাইম ম্যাগাজিন টার্নারকে “ম্যান অব দ্য ইয়ার” মনোনীত করে, কারণ তিনি ১৫০টি দেশের দর্শককে ইতিহাসের সাক্ষী করে তুলেছিলেন তাৎক্ষণিকভাবে। টার্নার ব্রডকাস্টিং-এর প্রাক্তন সিইও টেরি ম্যাকগার্ক বলেছেন, “টেড যা করেছিলেন, তা ছিল ইন্টারনেট বিপ্লবের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।”
রবার্ট এডওয়ার্ড টার্নার তৃতীয়, যিনি টেড নামেই পরিচিত, ১৯৩৮ সালের ১৯ নভেম্বর ওহাইওর সিনসিনাটিতে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র চার বছর বয়সে তাঁকে বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হয়। বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল জটিল — মদ্যাসক্ত বাবা চামড়ার বেল্ট দিয়ে শাসন করতেন। বারো বছর বয়সে ছোট বোন মেরি জিন বিরল এক ধরনের লুপাসে আক্রান্ত হন এবং বহু বছর যন্ত্রণায় কাটিয়ে মারা যান। এই মৃত্যু টার্নারের বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দেয় — তিনি বলতেন, “সে কোনো ভুল করেনি। খ্রিষ্টধর্ম এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি।” বাবা তাঁকে ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান, কিন্তু ক্লাসিকস পড়ার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে টিউশন বন্ধ করে দেন — বিখ্যাত সেই চিঠিতে লেখেন, “তুমি দ্রুত গাধা হয়ে যাচ্ছ।” টার্নার পড়া ছেড়ে ফিরে আসেন বাবার বিলবোর্ড কোম্পানিতে। এরপর ১৯৬৩ সালে মাত্র ৫৪ বছর বয়সে তাঁর বাবা আত্মহত্যা করেন।
ক্যারিয়ারের শীর্ষে থাকা অবস্থায় ১৯৮৯ সালে টার্নার অভিনেত্রী জেন ফন্ডার সঙ্গে পরিচিত হন এবং ১৯৯১ সালে বিয়ে করেন। দশ বছরের সম্পর্কে তাঁরা ছিলেন আমেরিকার অন্যতম আলোচিত দম্পতি। ফন্ডা পরে বলেছেন, “আমি তাঁকে যেভাবে ভালোবেসেছিলাম, সেভাবে আর কাউকে ভালোবাসিনি। কিন্তু আমি তাঁর জগতে — সর্বদা চলমান, সর্বদা উড়তে থাকা জীবনে — আর থাকতে পারছিলাম না।” বিচ্ছেদের ব্যথা বুকে নিয়ে টার্নার একই সঙ্গে হারাতে শুরু করেন তাঁর ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যও। ১৯৯৬ সালে প্রায় ৭৫০ কোটি ডলারে নেটওয়ার্কগুলো বিক্রি করেন টাইম ওয়ার্নারের কাছে। ২০০০ সালে এওএল-টাইম ওয়ার্নার একীভূতকরণ ব্যর্থ হলে মাত্র তিন বছরে তাঁর সম্পদ কমে যায় সাতশ কোটি ডলারেরও বেশি। ২০০৩ সালে তিনি পদত্যাগ করেন।
টেড টার্নার ২০১২ সালে সিএনএনের পিয়ার্স মর্গানকে বলেছিলেন, “জেনকেও হারালাম, চাকরিও গেল, সম্পদও গেল প্রায়। এক-দুই বিলিয়ন বাকি আছে। ওটা দিয়ে মিতব্যয়ী হলে চলা যায়।”
মিডিয়া জগৎ থেকে সরে গিয়ে টার্নার মনোযোগ দেন মানবকল্যাণে। ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘকে একশ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন — যা পূরণ করতে সময় লাগে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। তিনি ছিলেন উত্তর আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম ভূমির মালিক। আর্জেন্টিনা থেকে শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে ছিল তাঁর বিশ লক্ষ একর জমি। বিলুপ্তির পথ থেকে বাইসনকে ফিরিয়ে আনা তাঁর জীবনের অন্যতম বড় অর্জন — তাঁর ব্যক্তিগত মালিকানায় ছিল প্রায় একান্ন হাজার বাইসন, যা পৃথিবীর বৃহত্তম ব্যক্তিগত বাইসন পাল। পরিবেশ সচেতনতা তৈরিতে শিশুদের জন্য তৈরি করেন কার্টুন নেটওয়ার্কের “ক্যাপ্টেন প্ল্যানেট”। পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত পৃথিবীর জন্য তিনি ছিলেন সক্রিয় কণ্ঠস্বর।
জেন ফন্ডা টেড টার্নার সম্পর্কে বলেছিলেন, “সে স্বর্গে যাবে। আর সেখানে অনেক পশুপাখি তাকে স্বাগত জানাবে — যাদের বিলুপ্তির হাত থেকে টেড বাঁচিয়েছিল। সে একটা অলৌকিক মানুষ।”
সিএনএনের চেয়ারম্যান ও সিইও মার্ক থম্পসন বলেন, “টেড সর্বদা সিএনএনের প্রধান চালিকাশক্তি ছিলেন এবং থাকবেন। আমরা যে দৈত্যের কাঁধে দাঁড়িয়ে আছি — তিনি সেই দৈত্য।” জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত টার্নার সিএনএনকে তাঁর জীবনের “সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন” বলে গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করতেন।
