শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬

এপস্টাইনের আত্মহত্যার চিরকুট: “তদন্তে কিছুই পাওয়া যায়নি — বিদায় নেওয়াটাই ভালো”

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

বৃহস্পতিবার, মে ৭, ২০২৬

এপস্টাইনের আত্মহত্যার চিরকুট: “তদন্তে কিছুই পাওয়া যায়নি — বিদায় নেওয়াটাই ভালো”

আদালতের নির্দেশে প্রকাশিত হলো যৌন পাচারে দণ্ডিত কুখ্যাত ধনকুবের জেফ্রি এপস্টাইনের হাতে লেখা একটি চিরকুট — যা সাত বছর ধরে আদালতের ভল্টে তালাবদ্ধ ছিল। ২০১৯ সালের আগস্টে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টারের কারাকক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় জেফ্রি এপস্টাইনকে। নিউইয়র্কের চিফ মেডিকেল এক্সামিনার মৃত্যুর কারণ হিসেবে আত্মহত্যার রায় দেন। কিন্তু এপস্টাইনের মৃত্যু কখনোই নিছক মৃত্যু হিসেবে মেনে নেয়নি জনমানস। তাঁর বিশাল প্রভাবশালী যোগাযোগের জাল, কারাকক্ষের ক্যামেরা কাজ না করা, দায়িত্বরত কর্মীদের ঘুমিয়ে পড়ার ঘটনা — সব মিলিয়ে ষড়যন্ত্রের গল্পগুলো থামেইনি। আর সেই বিতর্কের মাঝেই ৬ মে, বুধবার নিউইয়র্কের ফেডারেল জেলা আদালতের বিচারক কেনেথ কারাস একটি চিরকুট প্রকাশের নির্দেশ দেন — যেটি এতদিন ধরে আদালতের সিলমোহরের আড়ালে লুকিয়ে ছিল।

নিউইয়র্ক টাইমস গত সপ্তাহে আবেদন করেছিল, চিরকুটটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। বিচার বিভাগ সেই আবেদনের বিরোধিতা করেনি। তারা আদালতকে জানায়, এই চিরকুট সত্যিই এপস্টাইনের লেখা কি না, তা তারা নিশ্চিত নয়; তবে জনস্বার্থের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত আদালতের ওপর ছেড়ে দিচ্ছে। বিচারক কারাস রাজি হন এবং আজ চিরকুটটি প্রকাশিত হয়।

চিরকুটে যা লেখা ছিল:

“They investigated me for months — FOUND NOTHING!!!”
“So 16-year-old charges resulted!”
“It is a treat to be able to choose one’s time to say goodbye.”
“Whatcha want me to do — bust out cryin!! NO FUN — NOT WORTH IT!!”

হলুদ লিগ্যাল প্যাডে হাতে লেখা এই চিরকুটে এপস্টাইন দাবি করেছেন, মাসের পর মাস তদন্ত করেও তাঁর বিরুদ্ধে কিছু পাওয়া যায়নি। তবু “ষোলো বছর আগের” অভিযোগ সামনে আনা হয়েছে। বিদায় নেওয়ার সময় নিজে বেছে নিতে পারাকে তিনি “সুবিধা” বলে উল্লেখ করেছেন। চিরকুটটি স্বাক্ষরিত নয়, তারিখও নেই। এর সত্যতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই হয়নি।

এই চিরকুটের গল্প শুরু হয় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে — এপস্টাইনের মৃত্যুর মাত্র আঠারো দিন আগে। ওই মাসেই গ্রেপ্তার হওয়ার কিছুদিন পর কারাকক্ষে তাঁকে আধাচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়; গলায় কমলা রঙের কাপড় পেঁচানো ছিল এবং সেখানে ঘষার দাগও দেখা যায়। তাঁর সেলমেট ছিলেন নিকোলাস টার্টাগলিওনে — নিউইয়র্কের ব্রিয়ারক্লিফ ম্যানরের সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, যিনি পরে চারটি হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন এবং বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি কারাগারে চারটি যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন।

সেই রাতে এপস্টাইন প্রথমে কারারক্ষীদের বলেছিলেন, টার্টাগলিওনে তাঁকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পরে তদন্তকারীদের জানান, তিনি নিজেই জানেন না কী ঘটেছিল এবং এ নিয়ে আর কথা বলতে চান না। তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল বিল বার পরে স্বীকার করেন, ঘটনাটি আসলে আত্মহত্যার চেষ্টার মতোই মনে করা হয়েছিল। এপস্টাইনকে এরপর আলাদা কারাকক্ষে সরিয়ে নেওয়া হয়। তিনি চলে যাওয়ার পর টার্টাগলিওনে দাবি করেন, একটি গ্রাফিক নভেলের পাতার ভেতর থেকে তিনি এই চিরকুটটি খুঁজে পান এবং তাঁর আইনজীবীদের হাতে তুলে দেন। নিকোলাস টার্টাগলিওনে পরে বলেন, “আমি বইটা খুলে পড়তে বসলাম — আর সেখানেই ছিল চিরকুটটা। সে লিখে রেখে গিয়েছিল।”

২০২১ সালের মে মাসে টার্টাগলিওনের আইনজীবীরা চিরকুটটি হোয়াইট প্লেইন্সের আদালতে দাখিল করেন — টার্টাগলিওনের খুনের মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ খণ্ডনের প্রমাণ হিসেবে। তাদের যুক্তি ছিল, এপস্টাইন নিজেই আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন; সুতরাং টার্টাগলিওনে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেননি। বিচারক মামলাটি সক্রিয় থাকায় চিরকুটটি সিলমোহর করে রাখেন। ২০২৩ সালে টার্টাগলিওনে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর একটি পডকাস্টে এই চিরকুটের অস্তিত্বের কথা প্রথম ইঙ্গিত দেওয়া হয়। নিউইয়র্ক টাইমস সেই সূত্র ধরে আদালতে আবেদন করে — এবং আজ সেই দরজা খুলে যায়।

চিরকুটের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। টার্টাগলিওনের সাবেক আইনজীবী ব্রুস বার্কেট বলেছেন, তাঁরা কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তাক্ষর বিশেষজ্ঞ দিয়ে এটি যাচাই করাননি, তবে এপস্টাইনের অন্যান্য লেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখে তারা কিছুটা আশ্বস্ত হয়েছিলেন। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, তারা এই চিরকুট সম্পর্কে আগে কিছু জানত না। সিবিএস নিউজ বা সিএনএন — কোনো সংবাদমাধ্যমই স্বাধীনভাবে এর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।

এপস্টাইনের পটভূমি বুঝতে হলে আরও পেছনে যেতে হবে। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় পতিতাবৃত্তিতে প্ররোচনার অভিযোগে দোষ স্বীকার করে মাত্র তেরো মাস কাউন্টি জেলে কাটান তিনি — সেই চুক্তির মাধ্যমে বড় ফেডারেল মামলা থেকে রেহাই পান। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে আবার গ্রেপ্তার হন; এবার নিউইয়র্কের ফেডারেল গ্র্যান্ড জুরি তাঁকে শিশু যৌন পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করে। অভিযোগ ছিল, ২০০২ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সী মেয়েদের নিয়মিত যৌন নির্যাতন করতেন। সেই গ্রেপ্তারের এক মাসের মধ্যেই, ১০ আগস্ট তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।

মৃত্যুর পর থেকেই ষড়যন্ত্রের গল্প থামেনি। কারাকক্ষের ক্যামেরা অকার্যকর ছিল, দায়িত্বে থাকা কর্মীরা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন — এই ব্যর্থতাগুলো বিতর্কে আরও ঘি ঢেলে দেয়। ২০২৩ সালে বিচার বিভাগের তদন্তে বলা হয়, কারা কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক অবহেলা ও ব্যর্থতার কারণেই এপস্টাইনের মৃত্যু ঘটেছে। ২০২৬ সালে ফেডারেল সরকারের তদন্তসংক্রান্ত লক্ষ লক্ষ নথি প্রকাশিত হয়, তবে সেগুলোও ষড়যন্ত্রের দাবিগুলো পুরোপুরি থামাতে পারেনি।

এপস্টাইনের সাবেক আইনজীবী অ্যালান ডার্শোভিৎজ সম্প্রতি দাবি করেছেন, এপস্টাইনের কাছে মাত্র একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে “তথ্য” ছিল — এবং সেই ব্যক্তি কোনো রাজনীতিবিদ নন। তিনি আরও দাবি করেন, এপস্টাইন শিশু নির্যাতনকারী ছিলেন না, কারণ তাঁর আগ্রহ ছিল শিশুদের প্রতি নয়, কিশোরীদের প্রতি — যদিও তাঁর বিরুদ্ধে চৌদ্দ বছর বা তার কম বয়সী মেয়েদের ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে।

চিরকুট প্রকাশের ঘটনা সেই দীর্ঘ বিতর্কে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করল — কিন্তু শেষ প্রশ্নের উত্তর দিল না। এপস্টাইন সত্যিই আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল — সেই প্রশ্ন বহু মানুষের মনে এখনো জীবিত।