মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করতে পারে যেসব অঙ্গরাজ্য

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ করতে পারে যেসব অঙ্গরাজ্য

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই প্রধান দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। আলাস্কা, মেইন, মিশিগান, ওহাইও, টেক্সাস, জর্জিয়া ও নর্থ ক্যারোলাইনাসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনী ফল সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে এসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে। কয়েকটি আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব নির্বাচনের ফল ওয়াশিংটনে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষ রয়েছে। একটি সিনেট, অন্যটি প্রতিনিধি পরিষদ। সিনেটের মোট সদস্য ১০০ জন। দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সিনেটর নির্বাচিত হন। তাঁদের মেয়াদ ছয় বছর। প্রতি দুই বছর পরপর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনেই প্রতি দুই বছর পর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট ও তাঁদের সঙ্গে থাকা দুই স্বতন্ত্র সিনেটরের সম্মিলিত আসন ৪৭টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে ডেমোক্র্যাটদের আরও চারটি আসন বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নিজেদের ঝুঁকিতে থাকা আসনগুলোও ধরে রাখতে হবে। এ কারণে কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

আলাস্কা: গুরুত্বপূর্ণ লড়াই

সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আলাস্কা। অঙ্গরাজ্যটিতে রিপাবলিকান সিনেটর ড্যান সুলিভানের মুখোমুখি হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক সদস্য মেরি পেলটোলা।

আলাস্কা ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি। ১৯৬৪ সালের পর অঙ্গরাজ্যটিতে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জয় পাননি। তবে বিভিন্ন সময়ে অঙ্গরাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাটরা অন্যান্য নির্বাচনে জয় পেয়েছেন।

২০২২ সালে প্রথম আলাস্কান আদিবাসী হিসেবে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েন পেলটোলা। সিনেটর নির্বাচিত হলে তিনি হবেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে দায়িত্ব পালন করা প্রথম আলাস্কান আদিবাসী নারী।

মাছ ধরার শিল্প, নিত্যপণ্যের দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এ নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া ব্যালটে ড্যান সুলিভান নামে আরেকজন প্রার্থী থাকায় ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।

মেইন: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা

মেইন অঙ্গরাজ্যে পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে নেমেছেন রিপাবলিকান সিনেটর সুসান কলিন্স। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসন।

গত জুলাইয়ে ডেমোক্র্যাট দলের মনোনয়ন পান জ্যাকসন। এর আগে দলটির প্রার্থী গ্রাহাম প্ল্যাটনার যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মেইনে জয় পেয়েছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস। ফলে অঙ্গরাজ্যটিতে কলিন্সের পুনর্নির্বাচনের লড়াই রিপাবলিকানদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং ট্রাম্পের নীতির প্রতি অসন্তোষ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং মেইনের ভোটারদের মধ্যে কলিন্সের প্রতিষ্ঠিত সমর্থন তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মিশিগান: প্রথম মুসলিম সিনেটর পাওয়ার সম্ভাবনা

ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স পুনর্নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় মিশিগানের আসনটি এবার উন্মুক্ত রয়েছে।

এ আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন চিকিৎসক ও ডেট্রয়েটের সাবেক স্বাস্থ্য পরিচালক আবদুল এল-সায়েদ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক সদস্য মাইক রজার্স।

নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হবেন এল-সায়েদ।

পররাষ্ট্রনীতি ও ইসরায়েল বিষয়ে তাঁর অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। এ বিষয়গুলো সামনে রেখে বিভিন্ন গোষ্ঠী প্রচারমূলক বিজ্ঞাপনও দিচ্ছে।

সিনেটের ক্ষমতার ভারসাম্যে এ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্ব পাচ্ছে মিশিগানের লড়াই।

ওহাইও: আসন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ডেমোক্র্যাটদের

ওহাইওতে ২০২৪ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়া সিনেটের আসনটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন সাবেক ডেমোক্র্যাট সিনেটর শেরড ব্রাউন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেড।

জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ এ নির্বাচনে ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

সিনেটের রাজনৈতিক ভারসাম্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে এমন নির্বাচনের তালিকায় রয়েছে ওহাইওর এই আসনও।

টেক্সাস ও জর্জিয়া: দুই দলের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ

টেক্সাসেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সিনেটের নির্বাচন। অঙ্গরাজ্যটিতে রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো।

১৯৭৬ সালের পর টেক্সাসে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জয় পাননি। কয়েক দশক ধরে অঙ্গরাজ্যটিতে শক্ত অবস্থানে রয়েছে রিপাবলিকানরা। তবে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে সিনেটের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আগের চেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ও ব্যক্তিগত বিতর্কও নির্বাচনী প্রচারে আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে জর্জিয়ায় নিজের আসন ধরে রাখার লড়াই করছেন ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক কলিন্স।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জর্জিয়ায় জয় পেয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এবার অঙ্গরাজ্যটিতে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করছেন অসফ। সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনে জর্জিয়ায় দুই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে। ফলে সিনেটের এই নির্বাচনও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

নজরে নর্থ ক্যারোলাইনা ও আইওয়া

নর্থ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রয় কুপারের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলি। হোয়াটলি রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান।

দীর্ঘদিন ধরে অঙ্গরাজ্যটিতে রিপাবলিকানদের শক্ত অবস্থান থাকলেও সিনেটের আসনটি নিজেদের দখলে নিতে চাইছে ডেমোক্র্যাটরা। এ কারণে নির্বাচনটি নিয়ে দুই দলেরই বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।

আইওয়ায় অবসর নিতে যাওয়া রিপাবলিকান সিনেটর জোনি আর্নস্টের আসনে লড়ছেন রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসন ও ডেমোক্র্যাট জশ তুরেক। আসনটি ধরে রাখার চেষ্টা করছে রিপাবলিকান দল।

সিনেটের লড়াইয়ে নিউ হ্যাম্পশায়ার ও কানসাস

নিউ হ্যাম্পশায়ারেও সিনেটের নির্বাচন নিয়ে আলোচনা রয়েছে। অবসর নিতে যাওয়া সিনেটর জিন শাহিনের ছেড়ে দেওয়া আসনে লড়ছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ক্রিস পাপাস ও রিপাবলিকান প্রার্থী জন সুনুনু।

সুনুনু সাবেক সিনেটর। ২০০৮ সালে পুনর্নির্বাচনের লড়াইয়ে জিন শাহিনের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন তিনি।

অন্যদিকে কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত অবস্থান থাকা অঙ্গরাজ্যটিতেও আসন বাড়ানোর সুযোগ খুঁজছে ডেমোক্র্যাটরা।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দলের লড়াইয়ে এসব অঙ্গরাজ্যের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।