বুধবার, ২৬ আগষ্ট ২০২৬

সন্তানের মুখ আর দেখা হলো না গুলিতে নিহত রাজুর

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

মঙ্গলবার, আগস্ট ২৫, ২০২৬

সন্তানের মুখ আর দেখা হলো না গুলিতে নিহত রাজুর

সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে প্রায় তিন বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন মো. ইউসুফ রাজু (৪৪)। অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে বাংলাদেশে রেখে যাওয়ার সময় স্বপ্ন ছিল, কাগজপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হলে দেশে ফিরবেন। পরে স্ত্রী ও সন্তানদেরও যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। নিউইয়র্কে দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।

শনিবার দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনের ইস্ট নিউইয়র্ক এলাকার ৮৪২ রকওয়ে অ্যাভিনিউয়ের আমেরিকান বেস্টউইং রেস্টুরেন্টে কাজ করার সময় গুলিবিদ্ধ হন রাজু। এ ঘটনায় তাঁর সহকর্মী মো. রাসেলও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। তিনি বর্তমানে ব্রুকডেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

নিহত রাজুর গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কংশনগর গ্রামে। আহত রাসেলের বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিপুলাশার ইউনিয়নের বড়কাছি গ্রামে।

সহকর্মী ও পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শনিবার রাতে রাজু ও রাসেল রেস্টুরেন্টে কাজ করছিলেন। রাত পৌনে ১২টার দিকে হঠাৎ এক দুর্বৃত্ত রেস্টুরেন্টে ঢুকে গুলি চালায়। প্রথমে রাসেলের ডান পায়ে গুলি লাগে। পরে রাজুকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায় ওই ব্যক্তি।

খবর পেয়ে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) ৭৩তম প্রিসিংকটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত দুজনকে উদ্ধার করে ব্রুকডেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকেরা রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন। রাসেলকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

রাজুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাতেই রেস্টুরেন্টে ছুটে আসেন তাঁর বন্ধু, সহকর্মী ও পরিচিতজনেরা। রোববার সকালেও রেস্টুরেন্টটির সামনে শোকাহত মানুষের ভিড় দেখা যায়। পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে থাকা রেস্টুরেন্টটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

সহকর্মীরা জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন রাজু। তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং বৈধভাবে কাজ করার প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও ছিল। তাঁর দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বয়স ১২ বছর, আর ছোট মেয়ের বয়স আড়াই বছর। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সময় তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। রাজু যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কয়েক মাস পর ছোট মেয়ের জন্ম হয়।

রেস্টুরেন্টের অন্যতম মালিক ও রাজুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু আবদুল জলিল শিপন বলেন, খবর পাওয়ার পরপরই তিনি রেস্টুরেন্টে এবং পরে হাসপাতালে ছুটে যান। রাজু কিংবা রেস্টুরেন্টের অন্য কোনো কর্মীর সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল বলে তাঁর জানা নেই। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও রাজুর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নিয়ে গেছে। রোববার রাত পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারের খবর তিনি পাননি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাসেল জানান, তিনি রান্নাঘর থেকে ফ্রায়েড চিকেনের একটি ট্রে নিয়ে সামনে আসার সময় এক ব্যক্তি তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। গুলিটি তাঁর ডান পায়ে লাগে। পরে ওই ব্যক্তি রাজুকে গুলি করে পালিয়ে যায়। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, হামলাকারী একজন মিশ্রবর্ণের কৃষ্ণাঙ্গ যুবক বলে মনে হয়েছে।

কুইন্সের ওজন পার্ক এলাকায় একটি ব্যাচেলর বাসায় থাকতেন রাজু। তাঁর রুমমেট মো. ফয়সাল জানান, বাসার সবার সঙ্গে রাজুর ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি নিজে রান্না করে খেতে পছন্দ করতেন। গভীর রাতে কাজ শেষে বাসায় ফিরে রান্না করতেন এবং দাবা খেলতেও পছন্দ করতেন।

ফয়সাল বলেন, রাজু যুক্তরাষ্ট্রে আসার পাঁচ-ছয় মাস পর তাঁর ছোট মেয়ের জন্ম হয়। কিন্তু এখনো মেয়েটিকে সরাসরি দেখার সুযোগ হয়নি তাঁর। অবসর পেলেই স্ত্রী ও মেয়েদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতেন। ২০২৭ সালে তাঁর মামলার চূড়ান্ত শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কাগজপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হলে দেশে ফিরে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি।

রাজুর স্বপ্ন ছিল সন্তানদের কাছে ফিরে যাওয়া। কিন্তু নিউইয়র্কে দুর্বৃত্তের গুলিতে সেই স্বপ্নেরও ইতি ঘটল। বাবাকে আর সরাসরি দেখতে পারবে না তাঁর দুই সন্তান, আর স্বামীকে হারিয়ে একাই সন্তানদের নিয়ে থাকতে হবে তাঁর স্ত্রীকে।

দ্য গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ ইনকের সভাপতি জাহিদ মিন্টু জানান, রাজু সংগঠনটির সদস্য ছিলেন না। তবে মানবিক দিক বিবেচনায় তাঁর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে রাজুর মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।