তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলের কাছে ইন্দোনেশিয়ার একটি যুদ্ধজাহাজকে নিয়ে নৌ মহড়ার পরিকল্পনা করেছে চীন। এই পরিকল্পনাকে ‘বিপজ্জনক’ ও ‘সামরিক উসকানি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তাইওয়ান। তাইপের অভিযোগ, পূর্বাঞ্চলীয় সমুদ্রসীমায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি বিভ্রান্তিকর ধারণা আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরতেই বেইজিং এমন উদ্যোগ নিয়েছে।
চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আগস্টের মাঝামাঝি তাইওয়ানের পূর্বে একটি এলাকায় ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর একটি জাহাজের সঙ্গে ‘নৌ চলাচল মহড়া’ অনুষ্ঠিত হবে। তবে মহড়ার সুনির্দিষ্ট স্থান বা সময় জানানো হয়নি।
তাইওয়ানের চীনবিষয়ক নীতিনির্ধারণী সংস্থা মেইনল্যান্ড অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল মঙ্গলবার রাতে এক বিবৃতিতে এই পরিকল্পনাকে সামরিক উসকানি হিসেবে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে এমন ‘বিপজ্জনক আচরণ’ থেকে চীনকে অবিলম্বে বিরত থাকতে হবে।
তাইওয়ানের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে পূর্ব উপকূলে তথাকথিত নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষার টহলের নামে চীন তাদের উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এখন অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামরিক মহড়ার উদ্যোগের মাধ্যমে বেইজিং আন্তর্জাতিক মহলে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে যে, তাইওয়ানের পূর্ব দিকের সমুদ্রসীমার ওপরও তাদের কর্তৃত্ব রয়েছে।
তাইওয়ানের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশটির পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, চীনের সঙ্গে মহড়ায় অংশ নেওয়ার জন্য ইন্দোনেশিয়ার যুদ্ধজাহাজটি বিশেষভাবে সেখানে যায়নি। জাহাজটি জাপান থেকে ফেরার পথে তাইওয়ানের পূর্বদিকে অবস্থান করছিল। ওই সময় এটি তাইওয়ানের পূর্ব উপকূল থেকে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল।
ওই কর্মকর্তা বলেন, সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনায় তাইওয়ানের জন্য সরাসরি কোনো হুমকি বা প্রভাবের আশঙ্কা নেই। তবে ঘটনাটির ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।
এদিকে ইন্দোনেশিয়া সত্যিই এই মহড়ায় অংশ নিচ্ছে কি না, তা জানতে দেশটির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে তাইওয়ানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
চীন দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে। অন্যদিকে তাইওয়ান একটি স্বশাসিত গণতান্ত্রিক অঞ্চল হিসেবে নিজেদের পরিচালনা করে এবং তাইপের সরকার বলে আসছে, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল তাইওয়ানের জনগণের।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানকে ঘিরে চীনা সামরিক বাহিনীর প্রায় নিয়মিত তৎপরতা তাইওয়ান প্রণালি ও আশপাশের অঞ্চলে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে।
বর্তমানে তাইওয়ান তাদের বার্ষিক ‘হান কুয়াং’ সামরিক মহড়া পরিচালনা করছে। এতে সম্ভাব্য চীনা হামলা মোকাবিলার বিভিন্ন পরিস্থিতিতে সামরিক প্রস্তুতি ও পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অনুশীলন করা হচ্ছে।
চীন-ইন্দোনেশিয়ার সম্ভাব্য নৌ মহড়ার খবর এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা চলছে। একই দিনে মার্কিন প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এলব্রিজ কোলবি জাকার্তায় ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী স্যাফ্রি সামসুদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। তবে তাইওয়ানে তিন লাখের বেশি ইন্দোনেশীয় অভিবাসী শ্রমিক বসবাস করেন।
তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় সমুদ্রসীমার কাছে চীন ও ইন্দোনেশিয়ার সম্ভাব্য যৌথ নৌ মহড়াকে ঘিরে তাইপের উদ্বেগ নতুন করে তাইওয়ান প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক উত্তেজনাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
তাইওয়ানের আশঙ্কা, সামরিক মহড়ার মতো উদ্যোগের আড়ালে চীন ধীরে ধীরে ওই অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
