বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬

বিভিন্ন দেশে পালিয়েছেন জুলাই মামলার অভিযুক্তরা, দেশে ফেরাতে নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

বুধবার, জুলাই ৮, ২০২৬

বিভিন্ন দেশে পালিয়েছেন জুলাই মামলার অভিযুক্তরা, দেশে ফেরাতে নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া হত্যা, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং অন্যান্য ফৌজদারি মামলায় সাবেক ক্ষমতাসীন দলের অনেক শীর্ষ নেতা অভিযুক্ত হয়েছেন। তাদের একটি বড় অংশ বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে সরকার ও বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার বক্তব্যে উঠে এসেছে। তবে প্রায় এক বছর অতিক্রম করলেও তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। 

জুলাই পরবর্তী গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বারবার বলা হয়েছে, জুলাইয়ের ঘটনায় জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং দেশে-বিদেশে যেখানেই থাকুক, আইনের আওতায় আনা হবে। বিভিন্ন সময়ে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকেও পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, সম্পদ জব্দ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য দৃশ্যমান নয়। এদিকে নবগঠিত বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলেও দেখা যাচ্ছে একই উদাসীনতা। 

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ভারতে অবস্থান করছেন বলে ব্যাপকভাবে আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ ও সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের যুক্তরাজ্যে অবস্থানের খবর বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। কানাডায় আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের এক শীর্ষ নেতার অবস্থানের তথ্যও আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানকে দেখা যাওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচিত হয়। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেনও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। 

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রত্যর্পণের জন্য প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, অভিযোগপত্র, গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক আশ্রয়, মানবাধিকার-সংক্রান্ত আপত্তি কিংবা মৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কার মতো বিষয়গুলোও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘ ও জটিল করে তোলে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সব দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই। ফলে ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে অবস্থানকারী কোনো অভিযুক্তকে ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু কূটনৈতিক অনুরোধ যথেষ্ট নয়; সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি কাঠামো, আদালতের সিদ্ধান্ত এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

আইনবিদদের মতে, যদি কোনো দেশ প্রত্যর্পণে সম্মত না হয়, তাহলে বিকল্প হিসেবে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি, পারস্পরিক আইনি সহায়তা গ্রহণ, সম্পদ জব্দ এবং আন্তর্জাতিক তদন্ত সহযোগিতা জোরদার করার পথ রয়েছে। তবে রেড নোটিশও কোনো আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নয়; এটি সংশ্লিষ্ট দেশকে একজন পলাতক ব্যক্তিকে শনাক্ত ও আটক করার অনুরোধমাত্র। শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার বা প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী হয়। 

এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সরকারের দৃশ্যমান তৎপরতা জনগণের প্রত্যাশার তুলনায় কম। তাদের দাবি, সরকারের উচিত নিয়মিতভাবে প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত অগ্রগতি জনসমক্ষে তুলে ধরা, যাতে জনগণ জানতে পারে কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ চলছে এবং কোথায় আইনি জটিলতা রয়েছে। 

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যর্পণ শুধু আইনি বিষয় নয়; এটি অনেক সময় কূটনৈতিক সম্পর্কেরও স্পর্শকাতর অংশ। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে আলোচিত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করে। ফলে এ ধরনের প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘায়িত হয়। 

পর্যবেক্ষকদের মতে, জুলাইয়ের ঘটনায় বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু দেশের অভ্যন্তরে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করলেই হবে না; বিদেশে অবস্থানরত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক আইনি-কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে এবং তার ফলাফল কী, সে বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা হলে জনমনে বিদ্যমান প্রশ্ন ও সংশয় অনেকটাই দূর হতে পারে। 

বিশ্লেষকদের অভিমত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রকৃত পরীক্ষা হবে তখনই, যখন প্রভাবশালী বা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও একই আইনি মানদণ্ড প্রয়োগ করে, আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।