মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

সোমবার, অক্টোবর ২৬, ২০২৬

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়াতে পারে বাংলাদেশ

চলতি বছর মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। একই সময়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার।

তবে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারতের চেয়ে বড় কিংবা বাংলাদেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি। বরং অর্থনীতির আকার, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির মতো সূচক বিবেচনায় দুই দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসায় সেই অগ্রগতি এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

মাথাপিছু জিডিপি কী বোঝায়?

একটি নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশের ভেতরে উৎপাদিত সব পণ্য ও সেবার মোট আর্থিক মূল্যকে মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি বলা হয়। এই পরিমাণকে দেশের মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় মাথাপিছু জিডিপি।

এই সূচক একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার ধারণা দেয়। তবে এটি প্রত্যেক নাগরিকের প্রকৃত আয় কিংবা জীবনযাত্রার মান সরাসরি তুলে ধরে না।

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি হতে পারে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ভারতের মোট জিডিপি হতে পারে প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থনীতির আকারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় আট গুণ বড়।

ক্রয়ক্ষমতায় এগিয়ে ভারত

ডলারের হিসাবে মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপির হিসাবে ভারত এগিয়ে রয়েছে। স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার দামের পার্থক্য বিবেচনায় নিয়ে করা এই হিসাবে ২০২৬ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার হতে পারে।

অর্থাৎ মাথাপিছু জিডিপির পরিমাণ বেশি হলেই মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেশি হবে, এমন নয়। স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও মানুষের প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসেও দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ সালে ভারতে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৫ শতাংশ। বাংলাদেশে এই হার দাঁড়াতে পারে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে। ফলে বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপ তুলনামূলক বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে ভারত

মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রগতি দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত নাও থাকতে পারে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ৩ হাজার ২১৯ ডলার। ভারতের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ৩ হাজার ৩৬ ডলার।

তবে ২০২৯ সালের মধ্যে ভারত আবার এগিয়ে যেতে পারে। ওই বছর ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার।

বাংলাদেশের অগ্রগতির পেছনে কী?

গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে তৈরি পোশাকশিল্প। প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের এই শিল্প দেশের রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় এবং উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থানের বিস্তারও অর্থনীতির অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে।

অন্যদিকে ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বহুমুখী। প্রযুক্তি ও ব্যবসায়িক সেবা, শিল্প, কৃষি এবং বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার দেশটির অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।

ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা আল জাজিরাকে বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ মেয়াদে দেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও কমেছে।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট মূল্য সংযোজনে উৎপাদনশিল্পের অবদান ২০১৪ সালের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশ হয়েছে। বিপরীতে ভারতের জিডিপিতে উৎপাদনশিল্পের অবদান ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে।

অগ্রগতির সামনে যেসব চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এর বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে দেশের আমদানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়ে।

এ ছাড়া বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাকশিল্প থেকে। লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় এই শিল্পের পণ্য পরিবহনেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সব মিলিয়ে, মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের ইঙ্গিত দেয়। তবে এই অগ্রগতির প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতার ওপর।