রবিবার, ২৪ মে ২০২৬

গ্রিন কার্ডের জন্য এখন দেশে ফিরতে হবে: ট্রাম্পের নতুন নীতিতে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী বিপাকে

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

শনিবার, মে ২৩, ২০২৬

গ্রিন কার্ডের জন্য এখন দেশে ফিরতে হবে: ট্রাম্পের নতুন নীতিতে লক্ষ লক্ষ অভিবাসী বিপাকে

পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা একটি দীর্ঘস্থায়ী নীতিতে আচমকা বড় পরিবর্তন এনেছে ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার মার্কিন সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস বা ইউএসসিআইএস এক আকস্মিক ঘোষণায় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ীভাবে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিকরা এখন থেকে আর আমেরিকায় বসে গ্রিন কার্ডের আবেদন সম্পন্ন করতে পারবেন না — তাদের নিজের দেশে ফিরে গিয়ে সেখান থেকে আবেদন করতে হবে। এই ঘোষণা অভিবাসী সহায়তা সংস্থা, আইনজীবী এবং লক্ষ লক্ষ অভিবাসীর মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি ও উদ্বেগের ঢেউ তুলেছে।

এই নীতি পরিবর্তনে যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন তাদের মধ্যে আছেন মার্কিন নাগরিকের সঙ্গে বিবাহিত বিদেশি নাগরিক, কর্মসংস্থান ভিসাধারী পেশাদার ব্যক্তি, শিক্ষার্থী ভিসাধারী এবং ধর্মীয় ভিসাধারী ব্যক্তিরা। এমনকি মানবিক সুরক্ষা পেয়ে থাকা শরণার্থী ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরাও এই নতুন নীতির আওতায় পড়তে পারেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর প্রায় ছয় লক্ষ মানুষ আমেরিকায় বসে গ্রিন কার্ডের আবেদন করে থাকেন — তারা সবাই এই নতুন নীতির শিকার হবেন।

ইউএসসিআইএস তাদের বিবৃতিতে বলেছে, “ছাত্র, অস্থায়ী কর্মী বা পর্যটক ভিসায় যারা আমেরিকায় আসেন তারা একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এবং সীমিত সময়ের জন্য আসেন। আমাদের ব্যবস্থা তাদের জন্যই তৈরি যারা সফর শেষে দেশে ফিরে যাবেন। তাদের এই সফর গ্রিন কার্ড প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করা উচিত নয়।” প্রশাসন এই পদক্ষেপকে বলছে “আইনের মূল উদ্দেশ্যে ফিরে যাওয়া” এবং একটি “ফাঁকফোকর বন্ধ করা।” তবে কেবল “অসাধারণ পরিস্থিতিতে” ব্যতিক্রম করা হবে, যা নির্ধারণ করবেন ইউএসসিআইএস কর্মকর্তারা নিজেরা।

বাইডেন প্রশাসনের সময় ইউএসসিআইএসের সিনিয়র উপদেষ্টা ডাগ র‍্যান্ড এই নীতির উদ্দেশ্য সম্পর্কে সরাসরি বলেছেন, “এই নীতির লক্ষ্য একেবারে স্পষ্ট। এই প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন যে তারা চান কম মানুষ স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পাক, কারণ স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা নাগরিকত্বের পথ — আর তারা সেই পথটি যতটা সম্ভব বেশি মানুষের জন্য বন্ধ করে দিতে চান।”

আমেরিকান ইমিগ্রেশন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সরকারি সম্পর্ক বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক শেভ দালাল-ধেইনি বলেছেন, “ইউএসসিআইএস দশকের পর দশক ধরে চলে আসা স্ট্যাটাস অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রক্রিয়াকে উল্টে দিতে চাইছে। এটি গ্রিন কার্ড চাওয়া যেকোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।” তিনি আরও জানিয়েছেন, বিদেশে অনেক মার্কিন কনস্যুলেটে ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য এক বছরেরও বেশি অপেক্ষা করতে হয়।

এই নীতির সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সংকট হবে তাদের ক্ষেত্রে যারা কোনো নিরাপদ দেশে ফিরে যেতে পারবেন না। বিশ্ব সংস্থা ওয়ার্ল্ড রিলিফ এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেছে, “যদি কোনো পরিবারকে বলা হয় যে অ-নাগরিক পরিবারের সদস্যকে তার দেশে ফিরে গিয়ে ইমিগ্রেশন ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে, কিন্তু সেই দেশে ইমিগ্রেশন ভিসা প্রক্রিয়াই চলছে না — তাহলে এটি একটি ফাঁদে পরিণত হয়। এই নীতিগুলো কার্যকরভাবে পরিবারগুলোকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আলাদা করে দেবে।” আফগানিস্তানের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর থেকে সেখানে মার্কিন দূতাবাস বন্ধ — ফলে আফগান নাগরিকরা কোথায় গিয়ে আবেদন করবেন?

ক্যালিফোর্নিয়া ইমিগ্রেশন প্রজেক্টের সিনিয়র স্টাফ অ্যাটর্নি জেসি ডি হ্যাভেন বলেছেন, “এটি কার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে তা বলা সত্যিই কঠিন। আমি মনে করি এটি মানুষের মধ্যে আবেদন করার ব্যাপারে ভয়ের একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে।” ইউএসসিআইএস এখনো পরিষ্কার করেনি এই নতুন নীতি কবে থেকে কার্যকর হবে, আবেদনকারীকে পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত বিদেশে থাকতে হবে কিনা, এবং যারা ইতিমধ্যে গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়ায় আছেন তাদের কী হবে।

এই ঘোষণা এমন একটি সময়ে এলো যখন ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে ডজনখানেক দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রক্রিয়া সীমিত বা স্থগিত করে রেখেছে এবং কিছু দেশের ক্ষেত্রে সরাসরি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, যে দেশগুলোর নাগরিকরা এখন ভিসা প্রক্রিয়ায় বাধার সম্মুখীন, তাদের যদি গ্রিন কার্ডের জন্য দেশে ফিরে যেতে বলা হয় — তাহলে তারা আর আমেরিকায় ফিরে আসতে পারবেন না। একজন আমেরিকান নাগরিকের বিদেশি স্বামী বা স্ত্রী, একজন মার্কিন হাসপাতালে কর্মরত বিদেশি চিকিৎসক, একজন আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শিক্ষার্থী — সবার জীবনেই এই নীতি পরিবর্তন ঘুরিয়ে দিতে পারে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার দিকে।