সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: ইতিহাস থেকে কী শিক্ষা মিলছে

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

সোমবার, নভেম্বর ২, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন: ইতিহাস থেকে কী শিক্ষা মিলছে

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস বলছে, ক্ষমতাসীন দলের ওপর ক্ষুব্ধ ভোটাররা প্রায়ই মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের অসন্তোষের প্রকাশ ঘটান। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা দেখছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, রিপাবলিকানরা কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক এই সমীকরণ বদলে দিতে পারবে?

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে। দলটি কংগ্রেসের অন্তত একটি, এমনকি উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে বলে ধারণা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

তবে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ব্যবধান কতটা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে শুধু ক্ষমতা দখলই নয়, কত বড় ব্যবধানে জয় পাওয়া গেল এবং কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কতটা শক্তিশালী হলো, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে ধারণা পেতে হলে ফিরে তাকাতে হবে উনিশ শতকের শেষ ভাগের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিকে। ওই নির্বাচন দুটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথে বড় পরিবর্তন এনেছিল।

যে দুটি নির্বাচন বদলে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনকে বলা হয় রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস বা পলিটিক্যাল রিয়্যালাইনমেন্ট। উনিশ শতকের শেষ ভাগের ১৮৭৪ ও ১৮৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন এ ধরনের পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।

১৮৭৪: গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পতন

যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের পর দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোতে পুনর্গঠন প্রক্রিয়া বা রিকনস্ট্রাকশন চলছিল। ১৮৭৬ সালের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়ার অবসান ঘটে। ওই নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী রাদারফোর্ড বি হেইস জনপ্রিয় ভোটে পরাজিত হলেও রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হন।

সমঝোতার অংশ হিসেবে দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলো থেকে কৃষ্ণাঙ্গদের সুরক্ষায় নিয়োজিত কেন্দ্রীয় সেনা প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার ও নাগরিক অধিকার সীমিত করার ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্য সরকারগুলোর বাধা কমে যায়।

তবে এই রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আরও দুই বছর আগে, ১৮৭৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে।

তৎকালীন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্রান্টের প্রশাসন দুর্নীতির অভিযোগ এবং ১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এ পরিস্থিতির সুযোগ নেয় ডেমোক্রেটিক পার্টি। নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে ৯০টির বেশি আসন বাড়ায় দলটি। দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় অনিয়ম ও ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও ওঠে।

এর মধ্য দিয়ে ১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের টানা আধিপত্যের অবসান ঘটে।

এদিকে দক্ষিণাঞ্চলে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দিতে সহিংসতার আশ্রয় নেয়। একপর্যায়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর সরকারও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। পরে কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আইন প্রণয়ন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় জিম ক্রো যুগ। প্রায় এক শতাব্দী ধরে এ ব্যবস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্য ও নিপীড়ন চলে।

১৮৭৪ সালের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের জয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পতনের পথ তৈরি করে। আর ১৮৭৬ সালের রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চল থেকে কেন্দ্রীয় সেনা প্রত্যাহার সেই প্রক্রিয়ার অবসান নিশ্চিত করে।

১৮৯৪: রিপাবলিকানদের উত্থান ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান

১৮৭৪ সালের পর প্রায় দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ প্রায়ই দুই দলের মধ্যে ভাগ হয়ে যেত। হোয়াইট হাউসেও ক্ষমতার পরিবর্তন হওয়ায় কোনো দলই দীর্ঘমেয়াদি নীতি বাস্তবায়নে স্থিতিশীল অবস্থান তৈরি করতে পারছিল না।

১৮৬৮ ও ১৮৭২ সালে ইউলিসিস এস গ্রান্টের জয় থেকে শুরু করে ১৮৯৬ সালে উইলিয়াম ম্যাককিনলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া পর্যন্ত কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থীই জনপ্রিয় ভোটের ৫০ শতাংশ পাননি। সময়টিকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে অচলাবস্থার যুগ হিসেবে দেখা হয়।

বিশেষ করে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের দ্বিতীয় মেয়াদ (১৮৯৩-১৮৯৭) ছিল নানা সংকটে জর্জরিত। ১৮৯৩ সালের অর্থনৈতিক মন্দা, বড় ধরনের রেলশ্রমিক ধর্মঘট এবং বেকার শ্রমিকদের বিক্ষোভ তাঁর প্রশাসনকে চাপে ফেলে। ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার আগে এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এর প্রভাব পড়ে ১৮৯৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। ক্ষুব্ধ ভোটাররা ক্ষমতাসীন ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাখ্যান করেন। নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে ১০০টির বেশি আসন হারায় দলটি।

নির্বাচনের আগে প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের আসন ছিল ২১৮টি। বিপরীতে রিপাবলিকানদের ছিল ১২৪টি। নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটদের আসন কমে দাঁড়ায় ১০৪টিতে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের আসন বেড়ে হয় ২৪৪টি। ফলে প্রতিনিধি পরিষদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় রিপাবলিকানরা।

এই ফল যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সূচনা করে। ১৮৯৬ সালে ম্যাককিনলির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে রিপাবলিকানদের নতুন আধিপত্যের শুরু হয়। তাঁর উত্তরসূরি থিওডোর রুজভেল্ট পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করেন। আধুনিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদের কাঠামো গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয় প্রেসিডেন্টের জন্য সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইতিহাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বড় পরাজয়কে প্রায়ই প্রেসিডেন্টের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হয়।

১৮৭৪ ও ১৮৯৪ সালের মতো বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় বিরল। তবে প্রতিনিধি পরিষদে ৪০টি বা তার বেশি আসন হারালেও প্রেসিডেন্টকে তাঁর রাজনৈতিক কৌশল ও অগ্রাধিকার নতুন করে বিবেচনা করতে হয়।

আধুনিক সময়ে হ্যারি ট্রুম্যান (১৯৪৬), ডুইট আইজেনহাওয়ার (১৯৫৮), লিন্ডন বি জনসন (১৯৬৬), জেরাল্ড ফোর্ড (১৯৭৪), বিল ক্লিনটন (১৯৯৪), বারাক ওবামা (২০১০) এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প (২০১৮) মধ্যবর্তী নির্বাচনে এমন রাজনৈতিক ধাক্কার মুখে পড়েছিলেন।

তবে পরবর্তী সময়ে তাঁদের রাজনৈতিক পরিণতি এক রকম হয়নি।

ট্রুম্যান, ক্লিনটন ও ওবামা কংগ্রেসে দলের পরাজয়কে রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগান। পরে তাঁরা আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

আইজেনহাওয়ার সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের কারণে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া জনসনও স্বেচ্ছায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান।

অন্যদিকে ফোর্ড ও ট্রাম্প পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরে যান। ফোর্ডের কাছে জিমি কার্টার এবং ট্রাম্পের কাছে জো বাইডেন জয়ী হন।

২০২৬ সালের নির্বাচনে কী হতে পারে

১৮৭৪ বা ১৮৯৪ সালের মতো বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয় ২০২৬ সালের নির্বাচনে ঘটার সম্ভাবনা কম। তবে ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষ প্রকাশের একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের নির্বাচন। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনের মতো এবারও অর্থনৈতিক অসন্তোষ এবং প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার বিষয়টি ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।

নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হবে। বর্তমানে সেখানে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের ২১২টি। অর্থাৎ খুব সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে রিপাবলিকান পার্টি।

ইতিহাস বলছে, ১৯৩০-এর দশকের পর থেকে মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৬ থেকে ২৭টি আসন হারিয়েছে। এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছিল ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটন এবং ২০০২ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশের শাসনামলের নির্বাচন।

বর্তমান জনমত জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসেও ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। উলফ রিসার্চসহ বিভিন্ন বিশ্লেষকের পূর্বাভাসে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পূর্বাভাসগুলোর ৯০ শতাংশের বেশি ডেমোক্র্যাটদের জয়ের পক্ষে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা আরও বাড়িয়েছে।

এ ছাড়া রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং নির্বাচনী এলাকার সীমানা দলীয় স্বার্থে পুনর্নির্ধারণের কারণে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ বদলাতে দেশজুড়ে ভোটের বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। কারণ, রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। কয়েকটি আসনে জয় পেলেই ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র পাঁচটি আসন নিজেদের দখলে নিতে পারলেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে ডেমোক্র্যাটরা। এমনটি হলে দলটির নেতা ও নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের প্রতিনিধি হাকিম জেফরিস প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার হতে পারেন। তিনি নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হবেন।

তবে সব পূর্বাভাস ভুল প্রমাণ করে রিপাবলিকানরা যদি তাদের সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে তা হবে প্রায় আট দশকের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ধারার বড় ব্যতিক্রম। হ্যারি ট্রুম্যানের প্রশাসনের সময় থেকে চলে আসা এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রভাবশালী ১০টি মধ্যবর্তী নির্বাচন

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত প্রেসিডেন্টের নীতি ও নেতৃত্বের ওপর ভোটারদের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন হারানোর প্রবণতা থাকলেও কিছু নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক গতিপথে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন এনেছে।

১. ১৮২৬: ‘ভালো অনুভূতির যুগের’ অবসান

১৮১৫ থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে ‘এরার অব গুড ফিলিংস’ বা ভালো অনুভূতির যুগ হিসেবে পরিচিত একটি সময় ছিল। এ সময়ে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা ও অঙ্গরাজ্যগুলোর অধিকারের মতো বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ কিছুটা কমে এসেছিল।

তবে ১৮২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট জন কুইন্সি অ্যাডামসের দল কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারায়।

তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের সমর্থকেরা এই জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নতুন রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। এর ধারাবাহিকতায় ১৮২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন জ্যাকসন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন যুগের সূচনা হয়।

১৮২৪ সালের নির্বাচনে জনপ্রিয় ও ইলেকটোরাল ভোটে এগিয়ে থাকলেও ইলেকটোরাল কলেজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাননি জ্যাকসন। ফলে প্রতিনিধি পরিষদের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন অ্যাডামস। এ ক্ষেত্রে হেনরি ক্লের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অ্যাডামসের ব্যয়বহুল অর্থনৈতিক নীতি ও জাতীয়তাবাদী অবস্থানের প্রতি অসন্তোষ ১৮২৬ সালের নির্বাচনে বিরোধীদের শক্তিশালী করে। পরে কংগ্রেসে জ্যাকসনের সমর্থকেরা একজোট হয়ে অ্যাডামসের বিভিন্ন উদ্যোগে বাধা দেন। এর মধ্য দিয়ে ভালো অনুভূতির যুগের অবসান ঘটে।

২. ১৮৫৮: বিভক্ত কংগ্রেস ও গৃহযুদ্ধের পথ

১৮৫৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটির গৃহযুদ্ধের পথ আরও সুগম হয়।

দাসপ্রথা নিয়ে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ চলছিল। ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জেমস বুকানান কানসাসে দাসপ্রথার পক্ষে সংবিধান প্রণয়নের বিতর্কিত উদ্যোগকে সমর্থন করায় তাঁর নিজের দলের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি হয়।

ডেমোক্র্যাটরা উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অন্যদিকে দাসপ্রথার বিস্তারবিরোধী অবস্থান নিয়ে গঠিত নতুন রিপাবলিকান পার্টি প্রতিনিধি পরিষদে সবচেয়ে বেশি আসন পায়।

রিপাবলিকানদের এই উত্থানে দক্ষিণাঞ্চলের দাসপ্রথার সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে। তারা হুমকি দেয়, রিপাবলিকান কেউ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবে।

১৮৬০ সালে আব্রাহাম লিংকন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি অঙ্গরাজ্য সত্যিই ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে দেশটি গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়।

৩. ১৮৭৪: পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার পতন

১৮৭৩ সালের অর্থনৈতিক সংকট এবং ওয়াশিংটনে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ প্রেসিডেন্ট ইউলিসিস এস গ্রান্টের রিপাবলিকান প্রশাসনকে দুর্বল করে দেয়।

১৮৭৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৯৬টি আসন হারায়। এ পরাজয় গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়। ১৮৭৬ সালের রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চল থেকে কেন্দ্রীয় সেনা প্রত্যাহারের পথও তৈরি হয়।

৪. ১৮৯৪: ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক বিপর্যয়

অর্থনৈতিক মন্দা ও শ্রমিক অসন্তোষের মুখে প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ডের ডেমোক্রেটিক পার্টি বড় ধরনের পরাজয়ের শিকার হয়।

নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে ১১৬টি এবং সিনেটে পাঁচটি আসন হারায় দলটি। এর ফলে দক্ষিণাঞ্চলের বাইরে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক প্রভাব অনেকটা কমে যায়। শুরু হয় রিপাবলিকানদের নতুন আধিপত্যের যুগ।

৫. ১৯১০: রিপাবলিকানদের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি

শুল্কনীতি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে দলের প্রগতিশীল অংশের সঙ্গে মতবিরোধ তৈরি হয় প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম হাওয়ার্ড টাফটের।

১৯১০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৫৭টি এবং সিনেটে ১০টি আসন হারায়।

দলের এই বিভক্তি ১৯১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টাফটের বিরুদ্ধে থিওডোর রুজভেল্টের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ তৈরি করে। এতে রিপাবলিকানদের ভোট বিভক্ত হয়ে পড়ে। সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাত্র ৪২ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট পেয়েও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী উড্রো উইলসন।

৬. ১৯৩০: মহামন্দা ও নিউ ডিলের পথ তৈরি

১৯২৯ সালের ওয়াল স্ট্রিট ধসের পর যুক্তরাষ্ট্র ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। তবে প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার সংকটের ভয়াবহতা কিছুটা কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, মানুষের উদ্বেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছিল।

এ পরিস্থিতিতে ১৯৩০ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা দেন ভোটাররা। প্রতিনিধি পরিষদে ৪৯টি এবং সিনেটে আটটি আসন হারায় দলটি।

এই জনঅসন্তোষ ১৯৩২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের জয়ের পথ তৈরি করে। কৃষক, শ্রমিক সংগঠন ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমর্থনে তিনি নিউ ডিল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হয় এবং আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি হয়।

৭. ১৯৪৬: ট্রুম্যানের ‘কিছুই করে না এমন কংগ্রেস’

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানকে চাপে ফেলে।

১৯৪৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদে ৫৬টি এবং সিনেটে ১৩টি আসন বাড়ায়। এর ফলে ১৯২৮ সালের পর প্রথমবারের মতো কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেয় দলটি।

তবে এই পরাজয়কে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগান ট্রুম্যান। তিনি বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটের দায় শুধু প্রেসিডেন্টের নয়, বরং নিষ্ক্রিয় এবং বড় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসেরও রয়েছে।

তিনি কংগ্রেসকে ‘ডু নাথিং কংগ্রেস’ বা কিছুই করে না এমন কংগ্রেস বলে আখ্যা দেন। এই সমালোচনাকে কাজে লাগিয়ে ১৯৪৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত জয় পান তিনি।

৮. ১৯৬৬: জনসনের ওপর থেকে মুখ ফেরান ভোটাররা

১৯৬৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন। তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণ ও সামরিক তৎপরতা বাড়তে থাকায় তাঁর প্রশাসনের জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে।

যদিও স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রশাসন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছিল, তবু যুদ্ধের রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

১৯৬৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৪৭টি এবং সিনেটে তিনটি আসন হারায়।

এ পরাজয় নিউ ডিলভিত্তিক রাজনৈতিক জোটের শক্তি কমিয়ে দেয়। এর ফলে ১৯৬৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী রিচার্ড নিক্সনের জয়ের পথ সহজ হয়।

৯. ১৯৯৪: রিপাবলিকান বিপ্লব

স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়া এবং সামরিক বাহিনীতে সমকামীদের কাজ করার ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন।

এই পরিস্থিতিতে নিউট গিংরিচের নেতৃত্বে বড় ধরনের নির্বাচনী সাফল্য পায় রিপাবলিকান পার্টি।

৪২ বছর পর কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেয় দলটি। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে ৫৩টি এবং সিনেটে সাতটি আসন হারায়।

পরাজয়ের পর রাজনৈতিক অবস্থান কিছুটা মধ্যপন্থী করেন ক্লিনটন। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও জয়ী হন তিনি।

তবে দুই বছর পর মনিকা লিউনস্কি কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ ক্লিনটনকে অভিশংসন করে। পরে সিনেটে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।

১০. ২০০২: ইতিহাসের ব্যতিক্রমী নির্বাচন

২০০২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রবণতার ব্যতিক্রম ঘটে। সাধারণত প্রেসিডেন্টের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের আসন কমে গেলেও এবার উল্টো ঘটনা ঘটে।

রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের দল প্রতিনিধি পরিষদে ছয়টি এবং সিনেটে দুটি আসন বাড়ায়। ফলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দলটির নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলার পর দেশজুড়ে জাতীয় ঐক্যের পরিবেশ এবং বুশের জোরালো নির্বাচনী প্রচার রিপাবলিকানদের এই সাফল্যে ভূমিকা রাখে।

২০০১ সালে বুশ প্রেসিডেন্ট হওয়ার সময় সিনেটে দুই দলের আসনসংখ্যা সমান ছিল। ফলে তাঁর প্রশাসনকে সিনেটে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির সমতা ভাঙার ভোটের ওপর নির্ভর করতে হতো। ২০০২ সালের নির্বাচনে জয় পেয়ে কংগ্রেসে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে রিপাবলিকানরা।

১৯৩৪ সালের পর এটিই ছিল দ্বিতীয় ঘটনা, যখন কোনো প্রেসিডেন্টের প্রথম মেয়াদের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দল কংগ্রেসের উভয় কক্ষে আসন বাড়াতে সক্ষম হয়। এর আগে ১৯৩৪ সালে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে নয়টি আসন বাড়িয়েছিল।

প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বের ওপর গণভোট

যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রতি আগ্রহ সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনের চেয়ে বেশি থাকে। তবে ইতিহাস বলছে, মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন পরিবর্তনের বিষয় নয়। অনেক সময় এসব নির্বাচন দেশটির রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনে।

২০২৬ সালের নির্বাচনও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কথা নয়। এই নির্বাচনে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন কোনো যুগের সূচনা হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবেন দেশটির ভোটাররা।