শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

নয় বছরের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তার ভবিষ্যৎ আর সাগরের গণকবর—রোহিঙ্গা সংকটের শেষ কোথায়?

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

বৃহস্পতিবার, জুন ৪, ২০২৬

নয় বছরের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তার ভবিষ্যৎ আর সাগরের গণকবর—রোহিঙ্গা সংকটের শেষ কোথায়?

আগস্ট ২০১৭। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আগুন জ্বলছিল। গ্রাম পুড়ছিল, মানুষ পালাচ্ছিল। প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা। সেই সময় বিশ্ব বিবেক নড়ে উঠেছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ক্ষোভ জানিয়েছিল। মানবাধিকার সংস্থাগুলো সরব হয়েছিল। জাতিসংঘের তৎকালীন মানবাধিকার প্রধান ঘটনাটিকে বলেছিলেন, “জাতিগত নিধনের পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ।”

নয় বছর পর সেই বিশ্ব অনেকটাই নীরব।

কক্সবাজারের পাহাড়ঘেরা শরণার্থী শিবিরগুলোতে এখনও বাস করছে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা। তাদের অনেকেই জানেন না কবে ফিরতে পারবেন নিজের দেশে। জানেন না আদৌ কোনোদিন ফিরতে পারবেন কি না। এরই মধ্যে কমছে খাদ্য সহায়তা, কমছে স্বাস্থ্যসেবা, কমছে আন্তর্জাতিক মনোযোগ। আর বাড়ছে হতাশা।

মঙ্গলবার জেনেভায় এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবার বালোচ সতর্ক করে বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক সহায়তা এখন চরম চাপের মুখে। সেই চাপের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ওপর।

চলতি বছরের জন্য বাংলাদেশ সরকার, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদাররা মিলে ৭১ কোটি ডলারের একটি মানবিক সহায়তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই লক্ষ্যই গত বছরের তুলনায় কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে। তবুও এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় অর্থের বড় একটি অংশ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

মানবিক কর্মীরা বলছেন, সংকটের সবচেয়ে কঠিন সময় হয়তো এখনই।

কারণ একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমছে, অন্যদিকে মিয়ানমারের পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হচ্ছে না। বরং নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় ২০২৪ সালের শুরু থেকে আরও প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। রাখাইনে সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ এখনও অব্যাহত। প্রত্যাবাসনের কথা যতটা আলোচনায় আছে, বাস্তবে তার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

ফলে লাখো রোহিঙ্গা এখন এমন এক বাস্তবতার মধ্যে বাস করছে, যেখানে অতীত হারিয়ে গেছে, বর্তমান অনিশ্চিত এবং ভবিষ্যৎ অন্ধকার।

কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে বেড়ে উঠছে একটি নতুন প্রজন্ম, যাদের জন্মই হয়েছে শরণার্থী হিসেবে। আন্তর্জাতিক রেসকিউ কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী প্রায় পাঁচ লাখ তরুণ-তরুণী কার্যত কর্মহীন অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন। তাদের জন্য নেই বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ, নেই স্বীকৃত উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা। একটি পুরো প্রজন্ম যেন অপেক্ষার মধ্যেই বড় হয়ে উঠছে।

জীবনযাত্রার অবস্থাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। কয়েক বছর আগে খাদ্য সহায়তা কমে এমন পর্যায়ে নেমে এসেছিল যে একজন শরণার্থীর মাসিক খাদ্য বরাদ্দ দাঁড়িয়েছিল মাত্র ৮ ডলার। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে কিছুটা উন্নতি এলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। চলতি বছরের শুরুতে একটি অগ্নিকাণ্ডে শত শত আশ্রয়কেন্দ্র পুড়ে যায়। মুহূর্তেই হাজারো মানুষ আবারও গৃহহীন হয়ে পড়ে।

আশ্রয়, খাদ্য ও নিরাপত্তাহীনতার এই বাস্তবতা থেকেই অনেক রোহিঙ্গা বেছে নিচ্ছেন আরেকটি ভয়ঙ্কর পথ—সমুদ্র।

বাংলাদেশের উপকূল থেকে ছোট ছোট নৌকায় করে তারা যাত্রা করেন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা থাইল্যান্ডের উদ্দেশে। সেই যাত্রার অধিকাংশই নিয়ন্ত্রণ করে মানবপাচারকারী চক্র। ভাঙাচোরা নৌকা, অনিশ্চিত গন্তব্য আর উত্তাল সাগরের মধ্যে শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে বিপজ্জনক অভিযান।

জাতিসংঘের তথ্য বলছে, ২০২৫ সাল ছিল রোহিঙ্গাদের সামুদ্রিক যাত্রার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর। প্রায় ৬ হাজার ৫০০ মানুষ সমুদ্রে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে প্রতি সাতজনের একজন আর ফিরে আসেননি। মৃত কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন প্রায় ৯০০ জন।

ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র বাবার বালোচের ভাষায়, “আন্দামান সাগর এবং বঙ্গোপসাগর দুর্ভাগ্যজনকভাবে হাজার হাজার মরিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য একটি চিহ্নহীন গণকবরে পরিণত হয়েছে।”

গত এক দশকে এই সামুদ্রিক পথে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ। তবুও যাত্রা থামছে না। কারণ শিবিরে থাকা অনেকের কাছেই অনিশ্চিত সমুদ্র এখন স্থবির জীবনের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়।

চলতি বছরও সেই চিত্র বদলায়নি। এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত আড়াই হাজারের বেশি রোহিঙ্গা সমুদ্রে যাত্রা করেছেন। মার্চের শেষ দিকে টেকনাফ উপকূল থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি নৌকা আন্দামান সাগরে ডুবে গেলে প্রায় ২৫০ জন নিখোঁজ হন। জীবিত উদ্ধার করা যায় মাত্র কয়েকজনকে।

এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় শিকার নারী ও শিশুরা। অনেকেই পাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার হন। অনেকে দিনের পর দিন খাবার ও পানি ছাড়া ভাসতে থাকেন সাগরে। অনেকের যাত্রার শেষ গন্তব্য হয়ে ওঠে অচিহ্নিত সমুদ্রতল।

অন্যদিকে মিয়ানমারে ফেরার পথ এখনও কার্যত বন্ধ। রাখাইনে সংঘাত অব্যাহত। নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা নেই, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই, সম্মানের সঙ্গে ফিরে যাওয়ার পরিবেশও নেই।

জাতিসংঘ বলছে, পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্বও শেষ হয়ে যায়নি।

বাংলাদেশ গত নয় বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। সীমিত সম্পদ নিয়ে ১২ লাখ মানুষের দায়িত্ব বহন করা কোনো সহজ কাজ নয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তা কমতে থাকলে সেই দায়ভার একা বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

নয় বছর আগে যারা আগুন, গুলি আর মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়েছিল, তারা এখনও অপেক্ষা করছে। তাদের অনেক সন্তান জন্ম নিয়েছে শিবিরে, বড় হচ্ছে শিবিরে। তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়, বাংলাদেশেরও নয়। তাদের পরিচয় যেন অনিশ্চয়তার মধ্যেই আটকে আছে।

রোহিঙ্গা সংকট তাই শুধু মানবিক সহায়তার প্রশ্ন নয়; এটি মানবতার পরীক্ষাও। আর সেই পরীক্ষায় বিশ্ব এখনও একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি—এই মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ কোথায়?