শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জৌলুস হারিয়ে চার ‘টুকরো’ ফোবানা

Author avatar
উত্তর আমেরিকা অফিস

শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬

জৌলুস হারিয়ে চার ‘টুকরো’ ফোবানা

সময়ের সঙ্গে উত্তর আমেরিকায় বেড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা। কমিউনিটিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা আঞ্চলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এসব সংগঠনের লক্ষ্য ও কার্যক্রমে ভিন্নতা থাকলেও একটি জায়গায় মিল রয়েছে—ঐক্য ও সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।

তবে সেই ঐক্যের দর্শন নিয়েই প্রশ্নের মুখে পড়েছে ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা—ফোবানা। বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা, নতুন প্রজন্মকে দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করা এবং প্রবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংগঠনটি চার দশকে এসে সাংগঠনিক বিভক্তির কারণে আলোচনায় এসেছে।

এবার লেবার ডে উইকেন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার চার শহরে একই সময়ে চারটি পৃথক ফোবানা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো ও টরন্টোয় আয়োজিত এসব সম্মেলনের প্রায় প্রত্যেক পক্ষই নিজেদের আয়োজনকে ‘৪০তম ফোবানা সম্মেলন’ হিসেবে প্রচার করছে।

একই সংগঠনের নামে একই সময়ে চারটি সম্মেলন—ঘটনাটি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে যেমন বিস্ময় তৈরি করেছে, তেমনি হতাশা ও ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, চারটির মধ্যে কোনটি আসল ফোবানা?

চার শহরে চার আয়োজন

৪ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর লেবার ডে উইকেন্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার চার শহরে একযোগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফোবানার ৩৯ বছর পূর্তি ও চার দশক পদার্পণের সম্মেলন। এবারের নিউইয়র্কের এস্টোরিয়ায় ইভাঞ্চল ক্রিস্টিয়ান চার্চ মিলনায়তনে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ফোবানা সম্মেলনটি উৎসর্গ করা হয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানকে। ‘এনআরবি অ্যাসোসিয়েশন’-এর আয়োজনে এ সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ‘চেতনায় ৭১ হৃদয়ে বাংলাদেশ’।

জাকারিয়া চৌধুরী (চেয়ারম্যান), দেওয়ান মনিরুজ্জামান (নির্বাহী সচিব), নূরুল আমিন বাবু (কনভেনর) ও মঞ্জুর কাদেরের (সদস্য-সচিব) নেতৃত্বে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটি সর্বসাধারণের জন্য এটি উন্মুক্ত রেখেছে। আয়োজনে স্থান পাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনা, অভিবাসন বিষয়ক সেমিনার, নারী ক্ষমতায়ন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

‘উত্তরণের পথে আগামীর প্রত্যয়ে প্রবাস বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সাল সিটির হিল্টন হোটেলে অনুষ্ঠিত হচ্ছে অপর একটি সম্মেলন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যালিফোর্নিয়ার আয়োজনে এতে ৫৪টি নিবন্ধিত সংগঠনের অংশগ্রহণ ও ২২টির পরিবেশনার কথা রয়েছে।

এতে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করবেন কালি প্রদীপ চৌধুরী। জয়নুল আবেদিন (কনভেনর), রবিউল করিম বেলাল (চেয়ারপারসন) ও খালেদ রউফের (নির্বাহী সচিব) পরিচালনায় এতে অতিথি হিসেবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ও লস অ্যাঞ্জেলেস সিটির মেয়রের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

ফ্লোরিডার কিসিমি এলাকার হলিডে ইন রিসোর্টে ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা’র উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে আরেকটি সম্মেলন। জাহিদ হাসান, আনোয়ার হোসেন সেন্টু ও রহিম র্যানিহালের নেতৃত্বে পরিচালিত এ সম্মেলনে সামাজিক-সমসাময়িক বিষয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র ও সংগীতের তারকাদের উপস্থিতিতে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছে।

এদিকে কানাডার টরেন্টোর ডন ভ্যালি হোটেল অ্যান্ড সুইটসে চার নম্বর সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গিয়াস আহমেদ, শাহ নেওয়াজ, আবু যুবায়ের দারা ও ফিরোজ আহমেদের নেতৃত্বে আয়োজিত এ সম্মেলনে প্রবাসীদের অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ ও অভিনেত্রী ববিতা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে। কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার নাহিদা সোবহানেরও এতে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

বিভক্তি নিয়ে নানা মত

সচেতন প্রবাসীদের কেউ কেউ মনে করেন, ফোবানা এখন অনেকের কাছে সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাব প্রদর্শনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কার আয়োজন বড়, কার মঞ্চে বেশি তারকা, কে বেশি স্পনসর পেলেন কিংবা কার অনুষ্ঠানে কত মানুষ হলো—এমন প্রতিযোগিতাও বিভক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ।

তাদের মতে, নেতৃত্বের এই প্রতিযোগিতার পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত অহমিকা ও প্রভাব বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা। ফলে ফোবানার যে সম্মিলিত শক্তি উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য কাজে লাগার কথা ছিল, তা একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

কিছু প্রবাসীর অভিযোগ, ফোবানা সম্মেলনে অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সুযোগ করে দেওয়ার নামে কারও কারও কাছ থেকে বিপুল অর্থ নেওয়া হয়। আমন্ত্রণপত্র, ভিসা-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগের বিনিময়ে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন কেউ কেউ। তারা এই প্রবণতাকে ‘দাওয়াত বাণিজ্য’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

অভিযোগকারীদের দাবি, ফোবানার আমন্ত্রণপত্র যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা আবেদনে সহায়ক নথি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এ সুযোগকে কেন্দ্র করে একটি আর্থিক বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। এমনকি ভিসা আবেদন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার নামেও অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও আয়োজকরা এই প্রশ্নে নিজেদের স্বচ্ছ থাকার ক্যথা জানিয়েছেন।

কেউ কেউ বলছেন, নেতৃত্বের কোন্দল ও বিভাজনের কারণে উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি কমিউনিটির বিপুল মেধা ও সম্ভাবনাকে একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।

ফোবানা কি আবার এক হতে পারবে?

বিভক্তি ও বিতর্কের বাইরে লেবার ডে উইকেন্ডে হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির কাছে চার আয়োজনই আনন্দের উপলক্ষ। কোথাও জনপ্রিয় শিল্পীদের গান, কোথাও জাদুর আয়োজন, কোথাও হলিউডের পাশে বাংলা সংস্কৃতির উৎসব, আবার কোথাও নিজের শহরে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে তিন দিনের মিলনমেলা।

শাড়ি-পাঞ্জাবি, দেশি খাবার, বাংলাদেশের গান, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা এবং সন্তানদের বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়—এসব আবেগ এখনো ফোবানাকে প্রবাসীদের কাছে মূল্যবান করে রেখেছে। আর সেই কারণেই বিভক্তির বিষয়টি আরও হতাশাজনক।

৪০তম বছরে ফোবানার সামনে তাই প্রশ্নটি কোন শহরের সম্মেলনে বেশি দর্শক হলো, কে বেশি তারকা আনল কিংবা কে বেশি স্পনসর পেল—তা নয়। প্রবাসীদের প্রশ্ন, যে সংগঠনের জন্ম হয়েছিল উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশিদের এক ছাতার নিচে আনতে, নেতৃত্বের বিভক্তি ও ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সেই ফোবানা কি আবার সত্যিকারের ঐক্যের প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারবে?

প্রসঙ্গত, ১৯৮৭ সালে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রথম সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফোবানার যাত্রা শুরু হয়। ফোবানার মূল লক্ষ্য ছিলো কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি, বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরা এবং এর প্রচার ও প্রসার, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রবাসীদের জীবন—যাত্রার মানউন্নয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে নানা ক্ষেত্রে সেতুবন্ধন রচনা করা।