যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর আবারও ভোটের লড়াই শুরু হয়েছে। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসন কতটা নির্বিঘ্ন হবে। বিশেষ করে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করবে এই নির্বাচন।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এতে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীরা কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এই নির্বাচনে রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের প্রশাসন আইন প্রণয়ন ও নীতি বাস্তবায়নে তুলনামূলক সুবিধা পাবে। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা তৈরি হতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কী?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাকে মধ্যবর্তী নির্বাচন বলা হয়। সাধারণত প্রতি দুই বছর পরপর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। এ কারণে প্রতি দুই বছর পর পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনে নির্বাচন হয়। অন্যদিকে, সিনেটের সদস্যদের মেয়াদ ছয় বছর। ফলে প্রতি দুই বছর পর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
কংগ্রেসের প্রধান দায়িত্ব হলো আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কার্যক্রম তদারকি করা। তাই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলে প্রেসিডেন্টের নীতি বাস্তবায়নের ক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়ে।
নির্বাচনে কোন কোন পদে লড়াই হচ্ছে?
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট হচ্ছে। পাশাপাশি সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এ ছাড়া কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনও হচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের গভর্নর নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
নির্বাচনে যেসব বিষয় প্রভাব ফেলছে
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি অর্থনীতি। জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্কনীতিও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, বিভিন্ন পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ফলে দাম বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।
অভিবাসন নীতিও দুই দলের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য তৈরি করেছে। রিপাবলিকানরা বলছেন, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার এবং অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ। তবে প্রশাসনের অভিবাসনবিষয়ক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। দুই দলের আইনপ্রণেতারাই এআইয়ের উন্নয়ন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের পক্ষে কথা বলেছেন। এ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান নিয়েও আলোচনা চলছে।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমানে কংগ্রেসের দুই কক্ষই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে। প্রতিনিধি পরিষদে দলটির আসন ২১৮টি এবং সিনেটে ৫৩টি। তবে প্রতিনিধি পরিষদে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব বেশি নয়। ফলে অল্প কয়েকটি আসনের পরিবর্তনেই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা বাধার মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের কার্যক্রমের ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়বে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন কংগ্রেসীয় কমিটির নেতৃত্ব দিতে পারবেন। সরকারি কর্মকর্তাদের শুনানিতে তলব করা, সরকারি নথি চাওয়া এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রম তদন্তের সুযোগও বাড়বে।
অন্যদিকে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন হলে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া এবং বিভিন্ন আইন পাস করাও ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তবে রিপাবলিকানরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে কংগ্রেসে ট্রাম্পের অবস্থান শক্তিশালী থাকবে। এতে তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রভাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট না হলেও ফলাফলকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি জনগণের সমর্থন যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই নির্বাচনের ফলাফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরেও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী, ট্রাম্প তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারবেন না।
তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল রিপাবলিকান পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও ট্রাম্পের সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে আলোচনাকে আরও জোরালো করতে পারে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের জন্যও এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। ভালো ফলাফল পেলে দলটির নেতারা ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারবেন। আর প্রত্যাশিত ফল না এলে দলের নেতৃত্ব ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন বণ্টনের লড়াই নয়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য, ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসন এবং আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রস্তুতির গতিপথ অনেকটাই নির্ধারিত হবে।
সূত্র: বিবিসি
